অমিয়ভূষণের মহিষকুড়ার উপকথা

0
759

অমিয়ভূষণের মহিষকুড়ার উপকথা : সাব-অলটার্ন তত্ত্বের আলোকে

সার্থক দাস।।

মিশরের শ্রেষ্ঠ পিরামিড-নির্মাতা সম্রাট খুফু নাকি প্রতিদিন তাঁর ছেলেদের নিজের সিংহাসনের পাশে বসিয়ে পুরনো জাদুকরদের সম্পর্কে একটি গল্প শোনাতে বলতেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র খাফ্রি – যাঁর রাজত্বকাল প্রায় চার হাজার নয়শো খ্রিষ্টপূর্বাব্দেরও আগে বলে জানা যায় – একবার এই সূত্রে একটি গল্প বলেছিলেন। খাফ্রির বলা সেই গল্পই নাকি পৃথিবীর আদিমতম গল্পের একমাত্র প্রামাণিক উৎস। এরপর পৃথিবী প্রায় কয়েক লক্ষ-কোটিবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ফেলেছে। মানব সভ্যতার মানচিত্র বদলেছে বহুবার। সভ্যতার পর সভ্যতায় সময়ের তালে আলো জ্বলেছে-নিভেছে। মান বদলেছে নিরক্ষরেখারও। তবু আজো মানুষর গল্প বলা বা গল্প শোনার তাগিদ হারায়নি একটুও। মানুষের গল্প বলার এই তাগিদকে শিল্পরীতিতে বেঁধে প্রথম সাহিত্যের রূপ পেতে দেখা গিয়েছিল পাশ্চাত্যে। সময়ের দাবিতে এই গল্প বলার ফর্ম নিয়ে বিভিন্নজনের মধ্যে চলেছে নানা গবেষণা। সেই থেকেই পাশ্চাত্য সাহিত্যিকদের হাত ধরে প্রথম জন্ম নেয় নভেল। পাশ্চাত্য এই শিল্পরীতিকে অনুসরণ করে বাংলায় উপন্যাস রচনার কাজে প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। দুর্গেশনন্দিনীর হাত ধরে ১৮৬৫ সালে বাংলা উপন্যাসের যে টালমাটাল পায়ে পথচলা শুরু হয়েছিল তা অনেকটাই পরিণতি পায় বিষবৃক্ষ-এ (১৮৭২)।

রবীন্দ্রযুগ অতিক্রম করে মানিক-তারাশঙ্কর-বিভূতি-শরদিন্দুর হাত ধরে পূর্ণ বলিষ্ঠতায় নির্ণীত হয়েছে বাংলা উপন্যাসের দিকরেখা। এরই মাঝে বিভিন্ন ঔপন্যাসিক উপন্যাসের নতুন নতুন ফর্ম নিয়ে গবেষণা করে গেছেন নিরন্তর। একসময় চরিত্রের তুলনায় বাস্তব জীবনের প্রতিফলন ঘটানোই ছিল উপন্যাসের মূলে। সময়ের তালে শুধুমাত্র জীবন-বর্ণনার একমুখী উদ্দেশ্যের পরিবর্তে প্রাধান্য পেয়েছে চরিত্র। চরিত্রদের ভাবনাকে লিখিতের রূপ দেওয়াই উঠে এসেছে উপন্যাসের মূলে। এরপর বিভিন্ন দেশ তাদের সমাজজীবনে মিশে থাকা বিভিন্ন কাহিনিকে তুলে ধরতে থাকল উপন্যাসে। তৈরি হতে শুরু করল নানা তত্ত্ব ও সংজ্ঞা। রুশ বিপস্নবকে কেন্দ্র করে গোর্কির হাত ধরে জন্ম নিল সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ সংবলিত উপন্যাস। কাফকাদের লেখনীতে ভর করে ইতোমধ্যে চেতনাপ্রবাহের রীতি মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল উপন্যাসের। আফ্রিকার ঔপন্যাসিকেরা যোগ করলেন লোকগাথা ও রূপকথাকে। মার্কেজ লাতিন আমেরিকার উপন্যাসে নিয়ে এলেন ম্যাজিক রিয়ালিজম। যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের ঔপন্যাসিকেরা তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কল্পনার রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন তাঁদের উপন্যাসগুলোকে। ঔপন্যাসিক মূলত মানব-অসিত্মত্বের অকপট সত্যসন্ধানী। ঔপন্যাসিক তাঁর কল্পনায় যে-রীতিই ব্যবহার করুন না কেন, উপন্যাসকে আবশ্যিকভাবে হয়ে উঠতেই হয় বাস্তব সত্যতার দলিল। উপন্যাসের মতো সত্যগ্রাহ্যতার দায় কবিতা বা নাটকের থাকে না। মানুষের জীবনে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া নানা বিষয়ের সাপেক্ষে ঔপন্যাসিক তাঁর কল্পনায় পাঠককে এমনভাবে মজিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন যাতে উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র আমাদের সত্য বলে মনে হয়। জীবনের না-পারা বা হতে-চাওয়ার সুপ্ত বাসনার প্রতিফলন পাঠকের মনে প্রতিবিম্বিত করাতেই একজন ঔপন্যাসিকের সার্থকতা।

বাংলা সাহিত্য যুগে যুগে বিভিন্ন সাহিত্যিকের শিল্পরীতিতে বারবার সমৃদ্ধ হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে বিভিন্ন তত্ত্ব নিয়েও। যে-সমস্ত সাহিত্যিক তাঁদের সৃষ্টিকে শুধু মনোরঞ্জন বা কাহিনি নির্মাণের আধার হিসেবে না দেখে বাংলা উপন্যাসকে পূর্ণ যুবতী করে তোলার লক্ষ্যে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে গেছেন, অমিয়ভূষণ মজুমদার তাঁদের মধ্যে অন্যতম। পাঠক তৈরির লক্ষ্যে নয়, উত্তরীয় কাঁধে ফেলে সভা অলংকৃত করার মতো সস্তার জনপ্রিয়তায় নয়, বরং নিজস্ব ফর্মকে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নবত্ব তৈরির মধ্যেই তাঁর সাহিত্যজীবনের মূল্যায়ন সম্ভব।

অমিয়ভূষণের পাঠক নেই। আপাতকঠোর ও অপ্রিয় হলেও তা মিথ্যে নয়। অচলায়তনের পঞ্চকেরা যে একাই তাদের উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে এগিয়ে যায় তার উদাহরণ ইতিহাস আমাদের বারবার দিয়ে এসেছে। প্রচলিত পথে হেঁটে তাঁর উপন্যাস কোনোদিন বেস্ট সেলারের তকমা পায়নি। তাঁবেদারি করেনি কোনো নামজাদা পত্রিকারও। কলকাতার উপকূলে সাহিত্য সাধনার বিস্তর উপকরণের পরিবর্তে সুদূর উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের মতো মফস্বলে বসেই চলেছিল তাঁর সমগ্র জীবনের বিচিত্র সাহিত্যসম্ভার তৈরির কাজ। তাঁর রচনায় এমন নতুন ভঙ্গি আছে, এমন বৈচিত্র্য আছে, ভাষা ব্যবহারে এমন বিস্ময় আছে যে মনোযোগী পাঠক ছাড়া তা আয়ত্ত করা অসম্ভব। পড়তে পড়তে গতি মন্থর হয়ে আসে, ফিরে যেতে হয় প্রাক্কথনে। অমিয়ভূষণ উপন্যাসের পাঠ নিয়েছিলেন বাডেন ব্রম্নকস ও ব্যাবিটের কাছ থেকে। ১৯৭৩ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নীরোজ বিশ্বাসকে তিনি বলেছিলেন – ‘উপন্যাস বলতে Boy meets a girl কখনো ভাবতেই পারি না।’

উপন্যাসের রীতিকে তিনি নিজের মতো করে নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর উপন্যাস নিয়ে আলোচনার পূর্বে উপন্যাস বলতে তিনি যে-রীতিকে বিশেস্নষণ করেছিলেন সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা দরকার। লিখনে কি ঘটে প্রবন্ধ সংকলনের ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’ পরিচ্ছেদে তিনি জানিয়েছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে উপন্যাস পোর্টমেন্টো নয় যে তার মধ্যে একই সঙ্গে মায়ের চিঠি, ফুটো মোজা ও ইসেত্মহার পুরে আধুনিকতার গাড়িতে চড়া যাবে। উপন্যাস আমাদের কৌতূহল নিবারণ করে না এবং আমাদের অ্যাডোলেসেন্ট যৌনপ্রবৃত্তির
পরিতৃপ্তির উপায়ও নয়। উপন্যাস তত্ত্ব নয়। এবং বোধহয় সেজন্যই উপন্যাসের ভাষাও বাক্যের পর বাক্য বসানো নয়। উপন্যাস গল্প নয় যে গল্পটা পাঠকের মাথায় ঢুকেছে কি না তা জানলেই ভাষা সম্বন্ধে সব জানা হল। উপন্যাস ইনসেস্ট ইত্যাদির বর্ণনা নয় যে সাংবাদিক মাত্রেই ঔপন্যাসিক হয়ে যাবেন। ওদিকে আবার উপন্যাস ভাষাচর্চাও নয় যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বলেই শেষের কবিতা উপন্যাস হয়ে উঠবে। অন্যদিকে উপন্যাস বড় করে গল্প বলা নয় যে কেউ এ বিষয়েও চালাকি করে বলবে উপন্যাস বড় গল্পও বটে। উপন্যাসে, একজন বিলেতি রসিকের কথা এনে বলা যায়, গল্প থাকায় আমরা দুঃখিত, এবং গল্প যে রাখা হয় তা গল্প বলার উদ্দেশ্যে নয়, কোনটা আগে কোনটা পরে ঘটছে তা ধরিয়ে দিতে। উপন্যাস প্রকৃতপক্ষে একটা থিম যা আমাদের চোখের নিচে ফুটে ওঠে। একটা থিম যা হয়ে ওঠে। অর্থাৎ থিম নামে এক জীবন্ত বিষয়ের ভাব।’

নীল ভুঁইয়া  (১৯৫৫), গড়াশ্রীখণ্ড (১৯৫৭), দুখিয়ার চিঠি  (১৯৫৯), নির্বাস (১৯৫৯), উদ্বাস্ত্ত (১৯৬২), রাজনগর (১৯৩১), ফ্রাইডে আইল্যান্ড অথবা নরমাংস ভক্ষণ এবং তাহার পর (১৯৮৮), তাসিলার মেয়ে (২০০৭, মরণোত্তর প্রকাশ), চাঁদবেনেসহ (১৯৯৩)আরো অসংখ্য উপন্যাস তাঁর সৃষ্টিতালিকাকে সমৃদ্ধ করেছে দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে। মহিষকুড়ার উপকথা (১৯৮১) ও মধু সাধুখাঁ (১৯৮৮) এই তালিকায় নিঃসন্দেহে দুটি উলেস্নখযোগ্য সংযোজন।

উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে শারদীয় পরিচয় পত্রিকায়। ১৯৮১ সালে ‘রক্তকরবী’ প্রকাশনা উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে। অমিয়ভূষণের অন্যান্য উপন্যাসের ভিড়ে মহিষকুড়ার উপকথার উলেস্নখযোগ্যতা হলো – উপন্যাসটি লেখকের পরিচিত ছকের বাইরে বেরিয়ে পাঠকের কাছে অনেকটাই সুখপাঠ্য ও বোধগম্যতার প্রশংসা অর্জন করতে পেরেছিল। উপন্যাসটির ভাষা এক গভীর রহস্যলোকে বিচরণ করলেও সৃষ্টি করেছে এক ভীষণ চমৎকারিত্ব। কাহিনি-নির্মাণের ভঙ্গি পাঠককে বরং গভীর মনোযোগীই করে তোলে। আরণ্যকে বিভূতিভূষণ, হাঁসুলী বাঁকের উপকথায় তারাশঙ্কর, পদ্মানদীর মাঝিতে মানিক, ঢোঁড়াই চরিত মানসে সতীনাথ ভাদুড়ী, তিতাস একটি নদীর নামে অদ্বৈত মলস্নবর্মণ, গঙ্গায় সমরেশ বসু, অরণ্যের অধিকারে মহাশ্বেতা নিম্নবর্গ সমাজের কথা যেভাবে তুলে এনেছিলেন সেই ধারাকেই সমৃদ্ধ করেছে এই মহিষকুড়ার উপকথা উপন্যাসটি। হয়তো এই সাহিত্য ধারার দ–ই ভর করে পরবর্তীকালে রচিত হয় সম্পূর্ণভাবে নিম্নবিত্ত মানুষের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে লেখা অভিজিৎ সেনের বহু চণ্ডালের হাঁড় কিংবা শুভংকর গুহের বিয়োর উপন্যাস দুটি।

পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রটির একেবারে সূচনায় সত্যজিৎ কয়েক সেকেন্ডের যে নির্বাক water spectacle নির্মাণ করেছিলেন ঠিক সেই চরম বাস্তবতায় উপন্যাসটির কাহিনি বিসত্মৃত। উপন্যাসের মূল ঘটনাপ্রবাহে অনেকটা যেন যামিনী রায়ের মতো ভিন্ন অবয়ব অংকনের চতুরতায় তিনি প্রলেপ লাগিয়ে গেছেন প্রতিটি চরিত্রে। প্রতিটি চরিত্র উপন্যাসে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছে চরিত্রের পূর্ণ ব্যাপ্তির লক্ষ্যে নয় বরং ঘটনার অমোঘ প্রয়োজনেই। অমিয়ভূষণ উপলব্ধি করতে পেরেই বলেছিলেন, ‘উপন্যাসের দায় তাকে বাস্তবের বিশ্বাস উৎপাদন করতে হয়।’

ভারতে নিম্নবর্গদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয় মূলত গৌতম ভদ্র, রণজিৎ গুহ, দীপেশ চক্রবর্তীদের হাত ধরে। পাশ্চাত্যে যা সাব-অলটার্ন তত্ত্ব নামে পরিচিত। মার্কসবাদে বিশ্বাসী ইতালীয় তাত্ত্বিক আমেত্মানিয় গ্রামসি কারাগারের নোটবই গ্রন্থটিতে প্রথম সাব-অলটার্ন শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৮৩ সালে এটি একটি বিশেষ তত্ত্বের মর্যাদা পায়। সুতরাং এই তত্ত্ব আলোচনার প্রায় দু-বছর আগেই অমিয়ভূষণ লিখে ফেলেছেন সাব-অলটার্ন বা নিম্নবর্গদের জীবনকথা নিয়ে মহিষকুড়ার উপকথা উপন্যাসটি। শুধু একমাতৃক তত্ত্বের নিরিখে এই উপন্যাসকে বিচার করা সম্ভব নয় একেবারেই, তবু বহুমুখী ভাবনার আলোকে সাব-অলটার্ন তত্ত্বটিই সবচেয়ে ভাস্বর।

উপন্যাসটির সূচনাবাক্যই পাঠকের মনে উপন্যাসটির ঘটনাস্থল সম্পর্কে স্পষ্ট-প্রাঞ্জল ধারণার জন্ম দেয়। ‘আমাদের এই গল্পটা মহিষকুড়া নামে এক নগণ্য গ্রামকে কেন্দ্র করে। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয়, বিস্তীর্ণ সবুজ-সাগরে একটা বিচ্ছিন্ন ছোট দ্বীপ।’ এই বিচ্ছিন্নতাই গ্রামটির মূল সম্পদ-কাহিনির আধার। মানচিত্র তন্নতন্ন করে দেখলেও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না এই গ্রামটির অবস্থান। ঔপন্যাসিকের কল্পনাগুণে গ্রামটি কাল্পনিক হলেও তার সত্যতার যেন বিন্দুমাত্র স্খলন ঘটে না। মহিষকুড়ার অবস্থান বর্ণনা সহজেই এই ইঙ্গিত দেয় যে, মহিষকুড়া আসলে কোচবিহার কিংবা আলিপুরদুয়ারের বিসত্মীর্ণ অরণ্য, পর্বত, নদী-পরিবেষ্টিত অঞ্চলেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহিষকুড়া এতটাই বিচ্ছিন্ন দীপের মতো যে এখানে ‘বনের হিংস্র জন্তুদের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, পিকনিকের আবহাওয়ায় নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে, কারণ মনে হতে থাকে এরা বোধহয় বনে পথ হারিয়ে যাওয়া এক মানবগোষ্ঠীর বংশধর, যারা এই বিচ্ছিন্নতাকে চোখের মণির মতো রক্ষা করে।’

মহাশ্বেতা তাঁর অরণ্যের অধিকারে যেভাবে অরণ্যকে বিশেস্নষণ করেছিলেন অমিয়ভূষণের বিশেস্নষণী ভঙ্গিমা সেই তুলনায় পৃথক। অমিয়ভূষণ তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে এক বিশেষ দর্শনের দ্বারা নিজেকে জারিত করেছেন। ‘ট্রমা’ শব্দটি তাঁর আলোচনায় ফিরে ফিরে এসেছে। অরণ্যকে তিনি অবচেতন মনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। মহিষকুড়ার গ্রামটি তাঁর কাছে অনেকটা অস্ফুট আবেগের মতো। কতগুলো ক্ষুদ্র উপকথার সমন্বয়ে এই উপন্যাসটির কায়া নির্মিত হয়েছে। একটি যেমন পূর্ণবয়স্ক মোষকে কেন্দ্র করে। উপন্যাসের শুরুতেই এই প্রথম উপকথাটি বর্ণনা করবে ‘জাফরুল্লা ব্যাপারী’র খামারে মোষের দুধ দোয়ানোর কাজে যুক্ত ‘চাউটিয়া বর্মন’। উপকথাটির শ্রোতা আসফাক। আসফাকও চাউটিয়া, সোভানদের মতোই ব্যাপারীর কর্মী। ভোটমারি থেকে একজন তার মাদি মোষকে জাফরুলস্নার খামারে নিয়ে এসেছিল পুরুষ মোষের সঙ্গে সঙ্গম করানোর জন্যে। খামারে থাকা দুটো মোষের মধ্যে প্রবীণ মোষটির জন্মবৃত্তান্ত প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছিল এই উপকথা। ব্যাপারীর ভূমিদাস আসফাকই উপন্যাসটির মূল চরিত্র। তাকে ঘিরেও একটি উপকথার বর্ণনা রয়েছে উপন্যাসে। উপন্যাসটিতে ‘আসফাক’ চরিত্রটির সঙ্গে চীনের উপন্যাস-রীতির বিশেষ মিল পাওয়া যায়। চিনুয়া আচেবে চীনের উপন্যাসে যে ‘হ্যালুসিনেশনে’র ধারা নির্মাণ করলেন তারই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন আসফাক। সেও হ্যালুসিনেশনের শিকার। জাফরুলস্নাকে সে পছন্দ করে না তবুও সে তার জন্য জীবনদায়ী ওষুধ আনতে কয়েক মাইল পথ হেঁটে শহরে যায়। পথ হারিয়ে তার সঙ্গে যা যা ঘটে এবং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যা সমগ্র উপন্যাসে তার চরিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে, সেই সমস্ত ঘটনা হ্যালুসিনেশনের প্রভাবকেই চিহ্নিত করে।

মহিষকুড়া গ্রামে জাফরুলস্না সামন্ত প্রভুদের প্রতিনিধি একটি চরিত্র। ১৯০৬ সালে গোর্কি মা উপন্যাসে যেমন সামন্তদের সঙ্গে দাসদের সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছিলেন সেই আবহাওয়াই যেন ফিরে এলো জাফরুলস্না এবং তাকে ঘিরে থাকা ভূমিদাস আসফাকসহ অন্যান্য চরিত্রের মধ্য দিয়ে। সামন্ত শ্রেণির অপর একজন প্রতিনিধি ‘বুধাই রায়’। যার কারণে বাবার মৃত্যুর পর আসফাককে ঘর ছাড়তে হয়। সাব-অলটার্ন বা নিম্নবর্গদের জীবনকথায় শোষকের শোষণযন্ত্র সর্বদা সুরক্ষিতই থাকে। ভারতের ইতিহাসে সাব-অলটার্নরা জীবনের সবকিছুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি, ধর্ম, বিশ্বাসে নির্ভর করে বেঁচে থাকাতেই আনন্দ অনুভব করে। আর সে কারণেই হয়তো জাফরুলস্না ‘কমরুণ’কে সহজেই গ্রহণ করতে পারে – আসফাকের সঙ্গী হওয়া সত্ত্বেও। কমরুণকে ঘিরেও বেশ কয়েকটি উপকথা উপন্যাসটিতে প্রচলিত। কমরুণ ছিল একসময়ে আসফাকের ‘বাউদিয়া’ প্রেমিকা। কমরুণের স্বামীর মৃত্যু হয় বসন্ত রোগে। কমরুণের সঙ্গে তারপর ঘটনাচক্রে পরিচয় ও প্রণয়ের সম্পর্ক হয় আসফাকের।

উপন্যাসটিতে অরণ্যচ্ছেদনের যে প্রসঙ্গ আসে তাতে মিশে থাকে ১৯৭৬ সালে তাত্ত্বিক রূপ পাওয়া ইকো-নভেলের। ভিন্ন পাঠকৃতির এই উপন্যাসে লেখকের ভাষা প্রয়োগ একটি বিশেষ দিক। ভাষা ব্যবহারে তিনি অধিক জটিল শব্দ যেমন ব্যবহার করেননি, তেমনি স্থানীয় ভাষারীতির প্রয়োগকে অহেতুক ও অমূলকও করে তোলেননি। প্রতিটি চরিত্র তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করেছে অতি সাবধানতায়, পাঠকের প্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে।

উপন্যাসের ভাষা সম্পর্কে লেখক জানিয়েছেন, সেখানে তো তারা একেবারে কোচবিহারের ভাষায় কথা বলতে পারত, কিন্তু ডায়ালগকে মিনিমাম রাখা হয়েছে। আমি যদি ওখানকার ভাষা ব্যবহার করতাম, আর সেটা সহজেই করতে পারতাম, সবাই বুঝবে না। আমার কমিউনিকেশন ইনকমপ্লিট থাকবে, কোচবিহারের বাইরে কেউ বুঝবে না। … তাহলে এ পথে গাইড করবে কে? গাইড করবে আমার কম্পোজিশন। It must be logical to the composition; আমি ডায়ালগ ঠিক ততটুকুই দেব, যতটুকু আমার কম্পোজিশনকে হার্ট করে না। যেমন, ‘ব্যাপারী ঘরত নাই’, ‘জানং’, ‘কুমর’, ‘কী খুবসুরত তোক দেখায়’, ‘মুই খানেক ভাবি নেং’, ‘তুই কেনে আসলু’, কিংবা ‘রাইতত’ ইত্যাদি। সংলাপের সহজতায় এই স্থানীয় শব্দগুলো বিরক্তির কারণ না হয়ে বরং উপন্যাসটিকে পাঠকের কাছে যৌবনবতী নারীর লজ্জাবনত দৃষ্টির মতোই আকর্ষণীয় করে তোলে।

নিম্নবর্গ মানুষের জীবনকথা বর্ণনাকে ঔপন্যাসিক এমন বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন যে তাদের চাহিদা, বেঁচে থাকার লড়াই, জমির দাবি, ক্ষুধার দাবি সমস্তই আজো যেন প্রাসঙ্গিক। যা কিছু কালকে অতিক্রম করতে পারে, তা-ই তো প্রকৃত সাহিত্যের উপাদান। সেই নিরিখে মহিষকুড়ার প্রাসঙ্গিকতাও চিরন্তনী। কাফকার উপন্যাসরীতি বারবার ফিরে এসেছে অমিয়ভূষণের লেখায়। মহিষকুড়ার উপকথাতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঔপন্যাসিক হাকিমের চরিত্রটির সঙ্গে তাই ঢিবি খোবলানো মোরগ ও আসফাকের চরিত্রের সঙ্গে ঝুঁটি ফুলিয়ে ঘুরে-বেড়ানো মোরগের তুলনা করেন। সাধারণ মানুষের দাবিকে যেমন রুশ বিপস্নবের প্রাককালে শাসক গুরুত্ব দিত না, শাসকের শোষণ বজায় থাকতো সমানভাবেই – ঠিক সেই সত্যের আলোকেই উদ্ভাসিত উপন্যাসটির শেষাংশ। আসফাক তাই দ্বারিঘরের সামনে এসে দেখে চাকর, ‘আধিয়া’র, গ্রামের মানুষের ভিড়ের মধ্যে একটা প্রকা- গাড়ি। … আর ঠিক সেই সময়েই সাত্তারের মুখে সে শুনতে পায় জাফরুলস্না পঞ্চায়েত প্রধান হয়েছে। গ্রামে আসা হাকিম আশ্বাস দিয়েছিল ‘গ্রামে আর, জমি জিরাৎ নিয়ে অন্যায় থাকবে না’। সেই বিশ্বাসে ভর করেই আসফাক হাকিমের কাছে ব্যাপারীর নামে নালিশ করেছিল। আর আজ সেই ব্যাপারীই গ্রামের সম্পূর্ণ ক্ষমতার মূলে। সাব-অলটার্ন বা নিম্নবর্গদের জীবনকথা এভাবেই গুমরে মরে। তাদের বিচার পরিহাসেরই নামান্তর মাত্র। আসলে মানব সভ্যতার ইতিহাসে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে নিম্নবর্গদের এই সম্পর্ক গা-সওয়া, স্বাভাবিক। কাম্য না হলেও সমাজে এর আজো কোনো প্রতিকার নেই। সে-কারণেই হয়তো মরিচঝাঁপির মতো অমানবিক ঘটনার পরেও ক্ষমতার গতিতে নিশ্চিন্ত মনে সেই খলনায়কেরাই বসে থাকতে পারে। আসফাক তাই মনে মনে বলে, ‘সব জমিই কারো-না-কারো। … যেমন বন আর বনের নয়, তাও অন্য একজনের।’

উপন্যাসটির মধ্যে মিশে আছে ‘Ecocriticism’-এর   প্রভাব। প্রচ্ছন্ন হলেও তা সময়ের দাবিতে উলেস্নখযোগ্য। ১৯৭৮ সালে উইলিয়াম রুখার্ট পরিবেশের সঙ্গে সাহিত্যের যোগসূত্র
দেখিয়ে এই তত্ত্বটি তুলে ধরেছিলেন। The Ecocriticism Reader-এর লেখক চেরিল গস্নটফেলটির বহু আগেই বিভূতিভূষণ লিখে ফেলেছিলেন আরণ্যক। তাঁর বহু বছর পরে হলেও অমিয়ভূষণ যখন মহিষকুড়ার উপকথায় অরণ্যকে কেন্দ্র করে মানব  সভ্যতার আস্ফালনের কথা বলেন তখন তত্ত্বগত আলোচনায় ‘Ecocriticism’-এর স্পটলাইটেই তাকে আলোকিত করা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। তত্ত্বকথা অনুসারেই উপন্যাসে দেখা যায় সভ্যতার অগ্রগতি কেমন করে বিনষ্ট করে দিচ্ছে প্রকৃতি, অরণ্যসম্পদ। মহিষকুড়ার গভীর অরণ্য কেটে ব্যাপারীর কয়েকশো বিঘা তামাক চাষের উপযুক্ত জমি তৈরি, বাথানের মহিষ ছাড়া বন্য মহিষের বিলুপ্ত হয়ে আসা অরণ্যের উপকরণের ওপর মানুষের হস্তক্ষেপকেই নির্দেশিত করে।

লেখকের ভাষায়, ‘লোহার শিকল পরানোর মতো কালো পিচের রাস্তা-সড়ক দিয়ে আমরা অরণ্যকে বেঁধে ফেলেছি। … যেদিন অরণ্যকে মানুষের লোভ গ্রাস করতে শুরু করেছে, সেদিন লাঙল শুধু মানুষের অগ্রগতির চিহ্ন না হয়ে আগ্রাসনের চিহ্ন হয়ে উঠেছে। অরণ্য হ্রাস পেয়েছে, সেখানে জেলা জন্ম নিয়েছে। সরকারি নির্দেশে যেটুকু অরণ্যসম্পদ ধরে রাখা আছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে রিজার্ভ ফরেস্ট।’ মহিষকুড়া নামটির মধ্যেই রয়েছে প্রকৃতির উপকরণের এক গভীর যোগ। মহিষদের বিচরণভূমি থেকেই এ-অঞ্চলের নাম হয় মহিষকুড়া। কিছু দূরে দূরেই নিজেদের চারণভূমির মধ্যেই প্রায় তিরিশটির মতো মোষ এই অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। কোনো কোনো দলে থাকত শতাধিক মোষও। কিন্তু মানুষের আস্ফালনেই সমস্ত মোষ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ‘সেই মোষগুলি … কোথায় গেল, কেউ জানে না।’

উপন্যাস সময়ের দাবি মেনে তার রীতিনীতি স্বমহিমাতেই বদলাতে থাকে। তবে সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কী করে নিম্নবর্গের স্বাধীনতা, চেতনা, মননকে গ্রাস করে নেয় সেই চিত্রই হয়তো ঔপন্যাসিক তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। নিম্নবর্গদের সমস্ত প্রতিবাদ মনে মনেই ঘটে। প্রকাশের সাহস বা ক্ষমতা কোনোটিই তাদের নেই। তাই আসফাক, ব্যাপারীর বিরুদ্ধে মনে মনে যুদ্ধে নেমেই শান্তি পায়। ‘তো ব্যাপারী তোমাকে থাপ্পড় মারছেন, দশ বিঘা ভূঁই দিচ্ছেন, মুইও চাষ দেং নাই। মুই ওষুধ আনং নাই। তোমরাও না মারেন। তামাম শুধ।’ ঔপন্যাসিক নিম্নবর্গের দিন বদল না দেখালেও সচেতনভাবেই তাকে ইঙ্গিতে রেখে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। উপন্যাসের বাহ্যজগৎ লেখকের কল্পনায় এমনভাবে পাঠকের সামনে উঠে এসেছে যে তার বিশেস্নষণ বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্ন রকম। বিশ্বের সমস্ত ক্ষমতার মূল উৎসে যে অর্থ আর এই অর্থের দ্বারাই যে মানব সভ্যতা চালিত তাকে অমিয়ভূষণের মতো এমন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন খুব কম লেখকই। উদ্দেশ্যের সফলতায়, উদ্দিষ্ট বার্তা প্রদানে তাই মহিষকুড়ার উপকথা ঔপন্যাসিকের উপন্যাসজীবনে অন্যতম পালক সংযোজনের উপাদান। 

১৯৮৬ সালে রাজনগর উপন্যাসের জন্য ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় অমিয়ভূষণ জানিয়েছিলেন, ‘আশির দশকের একজন উদীয়মান লেখক হিসেবে নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থিত হতে আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করছিলাম।’ একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘জীবন আমাকে জাগিয়ে রেখেছে এবং জগতে আমার ভালো লাগছে না। এই জাগরণে আমার বৃদ্ধি নেই … আমি ওই পারটিকুলার ধরনের এস্কেপ চাচ্ছি। মায়ের জঠরে যে এস্কেপ করেছিলাম জীবনকে ছোঁয়ার, জীবনকে আদিরূপে দেখবার, জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে যাওয়ার চেষ্টা … দর্শন জ্ঞানবিজ্ঞান ইত্যাদি দিয়ে তো নিজেকে জানা হলো না। সেসব দিয়ে যা জেনেছি তা আমাকে স্বসিত্ম দিচ্ছে না। সাহিত্য সৃষ্টির মূলে হয়তো অস্বসিত্ম থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা।’ অমিয়ভূষণ তাঁর লেখনীর ক্যানভাসকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বহু বহু আগের সমাজের মাঝেও। অমিয়ভূষণের উপন্যাসের ভাষা এমন এক জীবনবোধে পূর্ণ যা দ্বান্দ্বিক সময়ের প্রতিনিধি রূপে ভাস্বর হয়ে ওঠে। বিরাট ও ব্যাপ্ত ক্যানভাসে আমাদের প্রাপ্তি তাঁর সাহিত্যসম্ভারের বিচিত্রগামিতা। নানা ঘটনার মিউজিয়ামে তিনি যে নতুন ধরনের প্রেমচেতনা সাহিত্যে নিয়ে এলেন তা পরীক্ষামূলক হলেও নিঃসন্দেহে বৈচিত্র্যপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের প্রচলিত গদ্যের ছককে ভেঙে ব্যক্তিচিমত্মার মুনশিয়ানায় এক বলিষ্ঠ সফিস্টিফিকেশন পেয়েছিল তাঁর প্রতিটি গদ্য। কাহিনির গুরুত্ব, উপন্যাসের প্রয়োজনীয়তাকে ছুড়ে ফেলেও শুধুমাত্র গদ্যশৈলীর অসাধারণ মণিকারির কাজের জন্য তাঁর সাহিত্যকে পাঠ করা যায়। অমিয়ভূষণের উপন্যাসের ভাষা, দ্বান্দ্বিক ও বহুমুখী যে ভাবনাকে তুলে ধরে তা কেবল নিজস্ব সময়-সমাজ-ইতিহাসের সঙ্গে নয়, বরং উপন্যাসের পরম্পরার সঙ্গেও ভীষণভাবে একাত্ম। ন্যারেশনই তাঁর ভাষা ব্যবহারের বিশেষ একটি ধরন, যেখানে প্রেক্ষাপটের নিরিখে ডিসকোর্স প্রাধান্য পায়নি। মহিষকুড়ার উপকথা উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের উক্তি-উচ্চারণ প্রতিটি সংলাপে এমন একটি ভাষাকে পাঠকের সামনে পরিবেশন করা হয়েছে যা বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়েও যেন প্রচলিত বৃত্তের বাইরে তার অবস্থানকে সূচিত করে। তাঁর উপন্যাসের যে নির্দিষ্ট একটি argument আছে তা যেন অমত্মঃসলিলা। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের বহতার মতো।

আসলে ভাষা পোশাকমাত্র। যেহেতু তাঁর কাছে গল্প বলাটা কোনোদিনই মুখ্য ছিল না, সেই নিরিখে তিনি গল্প বলার খাঁজে খাঁজে জীবন সম্পর্কে চরম সত্যতাকেই তুলে ধরেছিলেন। পরিশেষে বহু প্রচলিত প্রবাদ ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’র মতো অমিয়ভূষণের ভাষাকে ব্যবহার করেই তাঁর সাহিত্যের মূল্যায়ন করা সম্ভব, ‘একদিক দিয়ে আমার সাহিত্যকে উত্তরবঙ্গের সাহিত্য বলতে পারো, কারণ যে ল্যান্ডস্কেপ এবং তার যে মানুষগুলো আমার গল্প-উপন্যাসে, তার অধিকাংশ পাহাড় থেকে শুরু করে পদ্মাকে অবলম্বন করে। কিন্তু অন্যদিক দিয়ে যদি এসবই সমস্ত পৃথিবীর এবং সমস্ত মানুষের প্রতিভূ না হয়ে থাকে, তাহলে সাহিত্য লেখা হয়েছে কি?’

(https://www.kaliokalam.com/%E0%A6%85%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%AD%E0%A7%82%E0%A6%B7%E0%A6%A3%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%95/)

অমিয়ভূষণের উপন্যাস ভাবনা মহিষকুড়ার উপকথা

সুস্মিতা কৌশিকী

 গড়পড়তা বাঙালি পাঠকের উপন্যাস ভাবনা যে উচ্চতায় শেষ হয়, তারও অনেক  উচ্চতায়  অমিয়ভূষণের উপন্যাস ভাবনার শুরু। তাই হয়তো তাঁর উপন্যাস পাঠকের সুস্বাদু (মুচমুচে মুখরোচক তিনি কোনদিন লেখেনই নি) মনে হয়নি। যারাও বা সাহস করে দু’ চারটি উপন্যাস  পড়েছেন, বুঝেছেন হজমকরা সহজসাধ্য নয়। তবে তাতে এই ঔপন্যাসিকের কিছু যায় আসেনি তিনি বেঁচে থাকতেও। কারণ তিনি সুনীল, হুমায়ূন, শীর্ষেন্দুর মতো শুধু সাহিত্য চর্চা করতে চাননি। তিনি আমৃত্যু শিল্পের অনুরাগী ছিলেন, এক নির্বিণ্ণ সাধক। বই লিখে টাকা করে ফুলে ফেঁপে ওঠা যায় ঠিকই কিন্তু তাতে শিল্প হয় না। শিল্প নিভৃত চর্চার বিষয়।  সমসাময়িক পাঠকের খোঁজে তিনি লেখেন নি কোনদিনই। কুচবিহারের আর এক বিশিষ্ট সাহিত্যিক অরুনেশ ঘোষকে  দেওয়া সাক্ষাৎকারে অমিয়ভূষন তাঁর সমকালীন ঔপন্যাসিকদের বিখ্যাত লেখা সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তাতে বাঙালি পাঠকের একশো ভাগ  বিস্ময়ের উদ্রেগ হয়। বিভূতি বন্দ্যোর আরন্যক পড়েছি, ভালো বই। তবে একে উপন্যাস বলা চলে না ” । তারাশঙ্করের কালিন্দী’র গল্প তাঁর ভালো লেগেছিল, ভালো লেগেছিল মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা র ‘ আরম্ভ আর প্রস্থান’  তবে ‘ পড়ে আলোড়িত হওয়ার মতো কিছু নয় ‘। অবশ্য এসবের কারণ দর্শিয়েছেন তিনি ” রাশিয়ান, ফরাসী, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান, ইটালিয়ান ( ইংরেজি অনুবাদে ) এবং বহু ইংরেজি ও আমেরিকান উপন্যাস পড়া থাকায় হয়তো এরকম হয়েছে। এসবের তুলনায় বাংলা উপন্যাসকে জোলো মনে হতো”।

    বলা বাহুল্য শুধু তত্ত্বে নয় অমিয়ভূষনের উপন্যাস- ভাবনা উপস্থাপনেও ব্যতিক্রমী। তাঁর ভাবনা ছকে বাঁধা পথে আটকে থাকেনি কারণ তিনি নিজেই বলতে ভালোবাসতেন ‘Boy meets a girl ‘  এর মধ্য দিয়ে উপন্যাসের পরিক্রমা তা তিনি কখনোই  ভাবতে পারেননি।”প্রকৃতপক্ষে  উপন্যাস পোর্টম্যান্টো নয় যে তার মধ্যে একই সঙ্গে মায়ের চিঠি, ফুটো মোজা ও ইস্তেহার পুরে আধুনিকতার গাড়িতে চড়া যাবে। উপন্যাস আমাদের কৌতূহল নিবারণ করে না এবং আমাদের অ্যাডোলেসেন্ট যৌনপ্রবৃত্তির পরিতৃপ্তির উপায়ও নয়। ” “উপন্যাস তত্ত্ব নয়।এবং বোধহয় সেজন্যই উপন্যাসের ভাষাও  বাক্যের পর বাক্য বসানো নয়। উপন্যাস গল্প নয় যে গল্পটা পাঠকের মাথায় ঢুকেছে কি না তা জানলেই ভাষা সম্বন্ধে সব জানা হল। উপন্যাস ইনসেস্ট ইত্যাদির বর্ননা নয় যে সাংবাদিক মাত্রেই ঔপন্যাসিক হয়ে যাবেন। ওদিকে আবার উপন্যাস ভাষাচর্চাও নয় যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন বলেই ‘শেষের কবিতা ‘ উপন্যাস হয়ে উঠবে। অন্যদিকে উপন্যাস বড় করে বলা গল্প নয় যে কেউ এ বিষয়ে চালাকি করে বলবে উপন্যাস বড়ও বটে গল্পও বটে ” উপন্যাস,একজন বিলিতি রসিকের কথা এনে বলা যায়,  ” গল্প থাকায় আমরা দুঃখিত, এবং  গল্প যে রাখা হয় তা গল্প বলার উদ্দেশ্যে নয়, কোনটা আগে কোনটা পরে  ঘটেছে তা ধরিয়ে দিতে।” “প্রকৃতপক্ষে একটা থিম যা আমাদের চোখের নীচে ফুটিয়ে তোলা হয়। একটা থিম  যা হয়ে ওঠে।অর্থাৎ থিম নামে এক জীবন্ত বিষয়ের ভাব”।

           অমিয়ভূষণের উপন্যাস সংখ্যা খুব বেশি নয় তবে একথা হলপ করে বলা যায় প্রত্যেকটি উপন্যাস বিষয়ে,ভাবনায়, উপস্থাপনের মাধুর্য্যে সাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। তিনি যে বিষয়কে উপন্যাসের উপজিব্য করে তুলতে চেয়েছেন তা একান্ত ভাবে জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। ঔপন্যাসিকের প্রত্যক্ষ সংযোগ না থাকলে তাঁর উপন্যাস কৃত্রিমতার দোষে দুষ্ট হতো। কিন্তু তা তিনি হতে দেন নি। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে খন্ডে খন্ডে ধরে নিজের কল্পনায়, বোধে, হৃদয়বত্তার প্রলেপে সঞ্জাত করে সম্পৃক্ত ও সংযুক্ত করেছেন তাই তো তিনি অনায়াসে বলতে পারেন     “আমি‌ শরৎচন্দ্রের মতো  বাসন – মাজা সাহিত্য লিখি না। আমি মহাশ্বেতা দেবীর মতো সেকেন্ডারী অভিজ্ঞতা দিয়ে লিখি না। বিবর আমি দু – পাতা পড়েছি। হাস্যকর। আমার স্ত্রী  আমাকে হাসুলি বাঁকের উপকথা তিনপাতা পড়ে শুনিয়ে ছিলেন। তারপর আর পড়িনি। রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ছাড়া আর গুলো কিছুই হয়নি। সুনীল গাঙ্গুলীর তো অনেক টাকা, কিন্তু বলার মতো লেখা ক’টা খুঁজে পাবেন? “

            এসব  উচ্চারণ কোন সাহিত্যিকের আত্মম্ভরিতা নয়, এ হলো শিল্পীর আভিজাত্য। তিনি সাহিত্য করে টাকা রোজগার করতে চাননি, তাই তো তিনি কোনদিনই প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী ছিলেন না। তিনি অনায়াসে বলতে পারেন ” আমি এক প্রতিষ্ঠিত প্রৌঢ় “, দৌড়ে তাঁর কোন স্পৃহাই ছিল না।অমিয়ভূষণ জাত শিল্পী।আর একজন শিল্পীর মনন সবসময় ঝুঁকে থাকে ধ্রুপদী পাঠে। অমিয়ভূষণের তরুণ বয়সে গোটা ইউরোপিয় গদ্য সাহিত্যে বিপুল আলোড়নের সময়। জার্মানিতে টমাস মান আর তাঁর ঠিক বিপরীতে ফানৎস্ কাফকা, ফরাসিতে আলবেয়ার কাম্যু ও জাঁ পল সার্ত্র, ইংরেজি ভাষায় জেমস্ জয়েস। সাহিত্য তাঁর নতুন দিশা খুঁজছে এঁদের অনুসিন্ধিৎসু কলমের আঁচড়ে। অমিয়ভূষণের সাথে ইউরোপিয় নতুন গদ্য সাহিত্যের যোগাযোগ কতটা ছিল — এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন …” এই লেখক গুলি প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র। এঁদের কোন গোষ্ঠী ছিল  না যে আন্দোলন বা আলোড়ন হবে। এঁদের উপন্যাস পড়ে সত্যিকারের পাঠক দম মেরে যায়, হয়তো তেমন সাহসী হলে তেমন কোনও ধৈর্যশীল দু- একটা অন্তর্গূঢ় প্রবন্ধ লেখেন। এখানে বলে রাখা ভালো সার্ত্র ও কাম্যুর নাম মান, কাফকা, জয়েসের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে  বলা বোধ হয় সংগত হয় না। ফরাসি নাম সেরকম বলতে হলে প্রুস্তের নাম করা যায় বরং। আসলে কাফকার বই ছাপা হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পরে। তা কী বিষয়ে এ বুঝতেই এখনও সময় চলে যায়।মানের বেলায় পাঠক বুঁদ হয়ে মানেই ডুবে যায়। এদের নিয়ে আলোড়ন করার মতো জনতা কোথায়। সার্ত্র ও কাম্যু প্রচারবিদ্ ছিলেন। তাঁদের দর্শন ছিল। তাঁদের দর্শন যত সোচ্চার তাঁদের শিল্প রং – চটা।” কতটা সমৃদ্ধ পাঠগ্রহন করে থাকলে একজন সাহিত্যিক অন্য জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যের সম্পর্কে এমন উক্তি করতে পারেন ভাবলে অবাক হতে হয় বৈকি। তবে এসব শুধু বলার জন্য বলা নয়, বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি হাতেকলমে কাজ করে দেখিয়েছেন। নিজের লেখা সম্পর্কেও তিনি দীপ্তকন্ঠী। তাঁর সাথে একমত হতেই হয় যখন তিনি বলেন ” আমার লেখা বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়ার জন্য নয়।।।আমার পঞ্চাশটা রিফাইড পাঠক হলেই চলবে। আমি লিখি পঞ্চাশ বছর পরের পাঠকের জন্য। আমার আদর্শ ব্যাসদেব। তিনি লিখেছিলেন কালো মানুষদের কথা। মহাভারত ব্যাসের নাতিপুতিদের গল্প। তিনিও কালো মানুষ ছিলেন। আমি লিখি হলুদ মানুষদের কথা রাভা, কোচ, মেচ, রাজবংশীদের কথা। আমি তাদের হাতের পাতার মত চিনি।” আসলে ১৯৬০ এর শেষ থেকে ১৯৬৩ এর গোড়ার দিক পর্যন্ত কোচবিহার ডাকঘরে টাউন ইন্সপেক্টর এবং কখনো ইন্সপেক্টর অব পোস্ট অফিসেস হিসাবে দায়িত্ব পালন কালে অমিয়ভূষন চষে বেড়িয়েছেন সংলগ্ন এলাকাগুলি, সাইকেলে, গ্রামের অলিগলি, বনের পথ, পথের ধারে বন, বনের নদী, নদীর সন্নিকটে অনুচ্চ পাহাড় সবই তার খুব পরিচিত, সবই তার লেখার বিষয়বস্তু।

    কুচবিহার- আলিপুরদুয়ার আসাম সংলগ্ন বনঘেরা ডুয়ার্স অঞ্চলের এমনই এক চির পরিচিত হলুদ মানুষ, এক অকিঞ্চন আসফাক,  যে তার একমাত্র রত্ন রমনী ও তার ঔরসজাতকে নিজের করে রাখতেও ব্যর্থ তারই কাহিনী ‘মহিষকুড়ার উপকথা ‘।  কিন্তু কথায় কথা বাড়ে আকারে ছোট কিন্তু ভাবে গভীর এই উপন্যাস বা উপন্যাসিকাটি ডালপালা বিস্তার করে বহুধা বিস্তৃত ও ব্যাপক অর্থে উঠে আসে পাঠকের কাছে। সমাজের নিম্নবর্গের গাথা থেকে হয়ে ওঠে চিরন্তনী মানবের কাহিনী — তারই এক সজল পাঠ নিতে ইচ্ছুক এই আলোচনায়।

      মহিষকুড়া কোন সম্ভ্রান্ত জনপথ নয়। এক নগন্য গ্রাম, বিস্তীর্ণ সবুজ সাগরে একটা বিচ্ছিন্ন ছোট দ্বীপ, জঙ্গলে ঘেরা সবুজ অরণ্যানীর কোলে বাস করা এক মানবগোষ্ঠির একান্ত আশ্রয়স্থল, যারা শুধু বিচ্ছিন্নতার ধারক নয় বাহকও। কিন্তু বৈপরিত্য এখানেই মাথাচারা দিয়ে ওঠে। দূর থেকে দেখলে মনে হওয়া আশ্চর্য নয় যে মহিষকুড়া, ছোটশালবাড়ি,ভোটমারি, তুরুককাটা গ্রামগুলি সবুজের কোলে ঘুমিয়ে আছে। সেখানেও আসলে কিন্তু জীবনচর্চার অদৃশ্য শৃঙ্খলগুলি বিদ্যমান। কারণ বনের বুক চিরে চলে যাওয়া মেটে পথ কিছুক্ষণের মধ্যেই সমঝোতা করে নেয় ঘনপিচের সড়কের সাথে। কালো পিচের রাস্তাগুলি যেন এইখানে বসবাসকারী বাসিন্দাদের জীবনের সীমাবদ্ধতা গুলির নির্ণায়ক শক্তি। এখানে অরণ্য অরণ্য নয়, সারল্য সারল্য নয়, জটিলতার জালে আবদ্ধ এক অবোধগম্যতা। কারণ যারা বনের বুকে ফুটন্ত কালো গরম পিচ ঢেলে সড়ক তৈরী করে আর যারা লাঙলের পিছনে ধৈর্য নিয়ে এগোয় তারা একই জাতের। আগুনে পুড়লে তবু আশা থাকে, ছাইয়ের তলা থেকে নবাঙ্কুর দেখা দেয়; লোভের লাঙলে পড়লে তেমন যে শাল – পদাতিকের নিরেট নিশ্চিদ্র ব্যূহ, এক বনস্পতির এলাকা থেকে অন্য বনস্পতির এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত বিষমুখ কাঁটালতার তেমন যে সব ব্যারিকেড — সব ধ্বসে যায়, তফাৎ শুধু আমাদের ভাবনায়। লাঙলের সঙ্গে লোভ শব্দটি যোগ করতে অনিচ্ছা উৎপাদন হয় এই কৃষিভিত্তিক দেশের প্রেক্ষিতে।

       এই মহিষকুড়া অঞ্চলেরই অলিখিত মালিক বছর ষাটের জাফরুল্লা ব্যাপারি সম্ভ্রান্ত কৃষক। তার গোয়াল ভর্তি গোরু মোষ, ঘরে চার বিবি, এক ছেলে, বাড়ি ভর্তি চাকরবাকর। প্রত্যেকেই জাফরুল্লার শাসনের কাছে জুবুথুবু আবার প্রত্যেকেই তার অধিনস্থ মূকপ্রাণের উপর নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে উদ্যত।ব্যতিক্রম শুধু আসফাক, এক বিচ্ছিন্ন,অন্তর্মুখী হলুদ গাত্রবর্ণের ভিন্ন মানুষ সে। মহিষকুড়ার উপকথা এমন এক কাহিনীকে তুলে ধরে ( নিছক গল্প বলা বা কাহিনীর ঘনঘটা অমিয়ভূষনের উপন্যাসে সর্বদাই অনিপস্থিত আর এই‌বিষয়েই তিনি এক ও অদ্বিতীয়। ) যার জন্য এমন এক প্রক্ষিতের প্রয়োজন যেখানে দ্বৈত সত্ত্বা  বিদ্যমান রয়েছে। মানুষ, মানবেতর, প্রকৃতি সকলেই দ্বৈতসত্তার অধিকারী এখানে। চাউটিয়া জাফরুল্লার একান্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত চারকদের মধ্যে অন্যতম, মোষের বাথানের কঠিন কাজগুলোর ভার তার উপরে, দুধ দোয়া ও শহরে চালান করাও তার কাজের মধ্যে পড়ে। বুনোমোষদের শাসনকরার বিশেষ কায়দা সে রপ্ত করেছে। সে এখন এই এলাকার বিশিষ্ট ফান্দি  ( বুনোমোষ ধরার লোক )। ছমির নিতান্ত সাধারণ কর্মী — ‘খড়িফাড়া ‘ ‘তরকারি বাগান তদ্বির’ করে, হাঁস মুরগি দেখা কামলাখাটা লোক কিন্তু সেও তার ক্ষমতা প্রদর্শন করে মোষ, গরু, পাঠা খাসি করার সময়। নাসির ও সাত্তার লাঙলদার, মূলত তামাকের ক্ষেতে তাদের কাজ। বঞ্জর জমিতে আশাতিরিক্ত ফসল ফলিয়ে তারা তাদের শ্রেষ্টত্বের দাবিদার। আসফাকের দ্বৈত সত্তা একেবারে ভিন্ন। সে কখনো মহিষ হয়ে যায়। না, এ রূপান্তর কাফকান মেটামরফোসিস নয়, এখানে মার্কেজের ম্যাজিক রিয়ালিজমও নেই, বা  ভার্জিনিয়া উলফের split personality,এ একেবারে বুনো গন্ধযুক্ত এক বনেচরের মনজগতের বিচিত্ররূপ। হরিণ হরিণীর বিচরণ ক্রিয়া যেমন মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে বাঘের তীঘ্ন দাঁতের আঘাতে আবার সেই বাঘের জয়ও শেষ কথা নয় তাকেও দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আহ্বান করে রক্তচক্ষু মহিষরাজ তার কালো,ছড়ানো প্রকান্ড এক জোড়া শিং এর দম্ভে। অযুত বিচিত্র চিত্রদেহ পাখপাখালি যেমন আছে, তেমনী অভাব নেই বিষধর অহিকুলের। ক্ষমতা যেমন আছে, তাকে দ্রুত উৎখাত করে নতুন ক্ষমতায়নও আছে। আবার এখানেই অরণ্য তার সতন্ত্র চরিত্র ঝেরে ফেলে ঢুকে যায় মানুষের চরিত্রের ভেতর, জীবনে, যাপনে। পশুদের নির্বীজ করার কাজটি একটু বাড়তি উৎসাহ নিয়েই করে থাকে ছমির। আসফাক লক্ষ্য করেছে ছমির মিঞা একটুও বিচলিত না হয়ে, বেশ আনন্দের সঙ্গেই চোখের নিমেষে কাজটা সেরে ফেলে।  কিন্তু পশুটির যন্ত্রনা আসফাকের মনবেদনাকে ছুঁয়ে যায় — সে পশুটির চোয়ালের দিকে চেয়ে থাকে, তার মনে হয় ” সেই মোষের এঁড়ের বড় বড় চোখ দিয়ে জল পড়ে সর্দির মতো শুকিয়ে আছে চোয়ালে ” কোথাও কী আসফাক নিজেকে দেখতে পায় এই মূক পশুর মধ্যে? তার অদম্য যৌবন, পৌরুষ বাঁধা পড়ে আছে, অকেজ হয়ে আছে জাফরুল্লার “পায়োর ” এর কাছে, ইংরেজি পাওয়ার শব্দটিকেই আসফাক যতদূর পারে উচ্চারণ করে — অনুধাবন করতে চেষ্টা করে। কী আজব এই শব্দ – কত বিচিত্র তার অর্থ ও অর্থের প্রসারণ। ঔপন্যাসিক মজুমদার এখানেই জাফরুল্লার  পৌরুষের প্রকৃতিগত অভাবকেই  যেন ইঙ্গিতে   দেখিয়েে দিতে  চেয়েছেন  তার বহিরাঙ্গের পাওয়ারের  আস্ফালনের মধ্য দিয়ে।

       ছমির বলে ‘পায়োর ‘বদলাতে গঞ্জে গিয়েই জাফরুল্লা তিসরা বিবিকে দেখতে পায় এবং এও বোধগম্য হয় যে তার বড় ও মেজ বিবির বয়স হয়েছে কিন্তু জাফরুল্লার পাওয়ার তখনও বর্তমান। যদিও এই তিন বিবিই দীর্ঘ পতিত একমাত্র কমরুনই জাফরুল্লা কে একটি সন্তান দিয়েছে বছর সাতেক আগে এবং তারপর থেকে দীর্ঘ দিন সেও পতিত। আর এই কমরুনই কোন এক অজ্ঞাত কারনে তার আত্মজকে শিখিয়ে দেয় আসফাককে  অন্যান্য চাকরের  মতো নাম ধরে না ডাকতে। তাই মুনাফ আসফাককে ” মিঞাসাহেব ” বলে ডাকে। এই সূত্র ধরেই আমরা ফিরে দেখতে পারি আসফাকের ধূসর অতীত এবং বুধাই রায়ের পাওয়ার। ছ বিঘা জমির ভাগচাষি আসফাকের বাপ। বাবার মৃত্যুর পর বুধাই জমিতে নতুন আধিয়ার দিল। আধিয়ার জমিবাড়ির দখল নিতে এলে ভয়ে গ্রাম ছেড়ে বনের পথে পা বাড়ায় আসফাক। সেই বনেই বেদিয়ার দলে সদ্য বিধবা কমরুনের সাথে তার দেখা ও ভাব ভালোবাসা। ” বিস্ময়ের মতো শোনালেও জন্মদরিদ্র আসফাক সেই প্রথম এক রত্ন দেখেছিল। নীলাভ বেগুনি রঙের মতো মেঘ – মেঘ পাহাড়ের কোলে সবুজ মেঘ মেঘ বনের মাথা। বাদামি রঙের সমান্তরাল সরলরেখার মতো গাছের গুঁড়ি, তার কোলে হালকা নীল নদীর জল। সেই নদী যেখানে সবুজে নীলে মিশানো কখনো মোষ – রঙের পাথরের আড়ালে বাঁক নিয়েছে, সেখানে সকালের চকচকে আলোয় নিরাবরণ এক বাঁকে ভরা জলে চকচকে মেয়েমানুষের শরীর। কমরুনের শরীরের উত্তাপ পেয়েছিল আসফাক। চেয়েছিল কমরুনকে নিয়েই বনে বনে ঘুরে বেদিয়ার জীবন কাটাবে। কিন্তু সেদিনও সে জানতো না পৃথিবীর সব জমিরই মালিক আছে, এমনকি বনও কারো না কারো মালিকানাধীন  যেমন তাকে একদিন জানায়  জাফরুল্লার বড়বিবি  ”  তা আসফাক, এই পিথিমিতে যত জমি দেখো, তা সবই কোনো না কোনো জাফরের। এই বন দেখো, তাও একজনের।” আর এই তথাকথিত মালিকরাই জাফরুল্লার মতো পায়োরের অধিকারী। তাই কমরুনেরও বুড়ো হেঁড়ে মাথা একবুক দাড়ির জাফরুল্লার মধ্যে বেদিয়া- দলপতিকে খুঁজে পেতে খুব বেশি দেরী হয়নি।  জাফরুল্লার পাওয়ার সর্বগ্রাসী, নির্বাক পশু থেকে শুরু করে নিশ্চলা বনপ্রকৃতি সবই তার ক্ষমতার নীচে স্তব্ধ আর এই ক্ষমতার অন্যতম হাতিয়ার তার বন্দুক ও সরু লাঠির মতো কালো চকচকে সেই নলটা থেকে যা বের হয়। উচ্চপদস্থ আমলাদের পোষাকের পাওয়ারও তো জাফরুল্লার পায়োরেরই অনুকুলে। তবু এই সবের বিপরীতে আছে আদি অকৃত্রিম পুরুষের শক্তি — আসফাকের মতো আর বুনো মোষটার মতো — যে দশ বছর আগে একবার এসেছিল, আর এ অঞ্চলের অনেক মোষই আকারে প্রকারে এখন অন্য মোষ থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছে যেমন হয়েছে মুনাফ। জাফরুল্লা, সরকারী আমলারা জাফরুল্লার অধিনস্থ সকলকর্মির ক্ষমতা ও নতুন ক্ষমতায়নের বিপরীতে আছে এক কোমলমতির মানুষ তার সমস্ত সহানুভুতি ও অন্ত:স্থিত বিদ্রোহ নিয়ে — যা প্রকাশ্যে আনার সাহসটুকু  সঞ্চয় করেও সে ব্যর্থ হয়,এই বিশাল ক্ষমতাজালের মধ্যে  আবদ্ধ হয়ে ছটফট করে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে মনে জাফরুল্লার  পাওয়ায়ের বিরুদ্ধাচারণ করে নিজের মনেই এক অদ্ভুত সুখ অনুভব করে।

        জাফরুল্লার ওষুধ আনতে শহরে যায় আসফাক। রাতের মধ্যেই ফিরে আসার কথা। বুড়ো  জাফরুল্লার হাত পা অবশ হয়ে আসে এই ওষুধের অভাবে।ছমির মিঞা অবশ্য মশকরা করে বলে বিবিদের ( বিশেষ করে ছোট বিবি আর কমরুনের ) ঘরে যেতেই মালিকের এই ওষুধের বিশেষ প্রয়োজন। মুহূর্তে আসফাকের মনে ঘুরে দাঁড়াবার ইচ্ছে বিদ্যুতের মতো চমক দিয়ে যায় — “এ ওষুধটা কি তেমন নয়,যার অভাবে মানুষ মরে? ধক করে উঠল আসফাকের বুকের মধ্যে ” কি ইঙ্গিত দিয়ে যান ঔপন্যাসিক? আসফাক ইচ্ছে করেই বনের পথ ধরে এবং পথ ভুলে সারারাত বনের মধ্যেই এলোপাথারি ঘুরে বেড়ায়। সে যেন নিজেকে নতুন ভাবে আবিস্কার করে সেই বনে, সেই নির্জন পরিবেশে। লটা ( ঘাস ) তুলে গোড়াটা মুখে দিয়ে মিষ্টি স্বাদে খুঁতখুত করে হাসে। ” সে তাড়াতাড়ি চলতে লাগল। আর সেই অবস্থায় গাছের পাতার ছায়া যেমন তার গায়ের উপরে ছায়ার ছবি আঁকছিল, তার মধ্যেও ভয় আর সাহস, আনন্দ আর উত্তেজনা, নানা রেখা এঁকে নাচতে থাকল। সে এবার আরো জোরে আরো টেনে আঁ – আঁ- আঁ ড় শব্দ করে ডেকে উঠল। কান পেতে শুনল, প্রতিধ্বনি যেন একটা উঠছে। আর সেই মুহূর্তে সে অনুভব করল সে মোষ হয়ে গিয়েছে। একটা বুনো মোষ সে নিজেই, এই ভেবে তার নিঃশ্বাস গরম হয়ে ফোঁসফোঁস করতে লাগল। সে প্রাণভরে ডেকে উঠল আঁ আঁ ড়।।।আর ঠিক এখানেই গল্পটা আর অকিঞ্চনের একমাত্র রত্ন রমনী আর তার আত্মজ কে হারিয়ে ফেলার গল্প থাকে না। যে মানুষ প্রেম শব্দটি পর্যন্ত শোনেনি তার মধ্যেও জ্ঞানবৃক্ষের ফলের আভাস উঁকি দিয়ে যায়। আসফাক নিজে নিজেই বলতে থাকে ” কিন্তুক মোর দেরিটা থাকি গেইল “। নির্বিষ প্রতিশোধের হাসি খুঁতখুত করে হাসে ” তো ব্যাপারি, তোমরা থাপ্পর মারছেন, দশবিঘা ভুঁই দিছেন, মুইও চাষ দেং নাই “। “মুইও দেরি করছং, তোমরা মারেন নাই। তামাম শুধ।

           কাহিনীর একটানা ন্যারেটিং থেকে মুক্তি দিয়ে ঔপন্যাসিক অসংখ্য খন্ড চিত্রে, উপকাহিনীতে, ইতিহাস কথায় উপন্যাসকে গতিশীল  করেছেন, যা  আদতে এই উপকথাকে অনন্যতা দান করে জনমানুষের কথায় পরিনত করেছে । আর এই কাজে সবচেয়ে বেশি সহায়ক হয়েছে উপন্যাসে ব্যবহৃত ভাষা। অমিয়ভূষণের উপন্যাস সম্পর্কে দুটি লাইন লিখলেও একটি লাইন অবশ্য তার ভাষাশৈলী নিয়ে কথা বলবে। উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাসে যে ভাষার তিনি ব্যবহার করেছেন বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে তা শুধু কমলকুমার মজুমদারের  সঙ্গেই তুলনীয়। তবে কমলকুমারের বাংলার মতো তা ফরাসীগন্ধী নয় মোটেও, অমিয়ভূষনের ভাষা আদ্যান্ত বাংলা। একটি আঞ্চলিক ভাষাকে তিনি এমন মিষ্টতা দান করেছেন যে তা বিশিষ্টের ভাষা বলেই বোধ হয়। মহিষকুড়ার উপকথা য় তিনি  কথোপকথনের জন্য রাজবংশী ভাষার ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত সতর্কভাবে যেন পুরো উপন্যাসটি আঞ্চলিক উপন্যাসে পরিগনিত না হয়। একদিকে যেমন চরিত্রকে সজীব ও অকৃত্রিম রাখতে, অন্যদিকে তাঁর thought process কেও চালনা করতে তিনি রাজবংশী ভাষায় dialogue ব্যবহার করেছেন স্থানে স্থানে কিন্তু   নিয়ন্ত্রিত ভাবে  যাতে পাঠকের সাথে কমিউনিকেশন ইনকমপ্লিট না থাকে। ১৯৬২ সালের শারদীয় গণবার্তায় ‘একটি খামারের গল্প ‘নামে যে গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল তাই ছিল মহিষকুড়ার উপকথা উপন্যাসিকার বীজস্বরূপ। ১৯৭৯ সালে শারদীয় পরিচয় পত্রিকায় মহিষকুড়ার উপকথা র প্রকাশকাল, এই মধ্যবর্তী সময়ে লেখক যে তাঁর শব্দ ভান্ডার কে পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত করেছেন তা দুটি লেখা পাঠেই স্পষ্ট হয়ে যায়।এইখানেও  অমিয়ভূষনের অনন্যতা। তিনি এক ও অদ্বিতীয়।

কথা ঋণ:

প্রবন্ধ সংগ্রহ – অমিয়ভূষন মজুমদার

(http://rongroot.blogspot.com/2018/11/blog-post_42.html)

অমিয়ভূষণ মজুমদারের উপন্যাসের ইতিবৃত্ত

সুব্রত কুমার দাস

লিংক- (http://bdnovels.org/%E0%A6%85%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%AD%E0%A7%82%E0%A6%B7%E0%A6%A3-%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A6%AE%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AF/

মহিষকুড়ার উপকথা: আধুনিকতা ও প্রকৃতির লড়াই

রানা রায়হান

‘মহিষকুড়ার উপকথা’য় গভীর বন-জঙ্গল পরিবেষ্টিত একটা গ্রাম ও সেখানকার মানুষের জীবন-অভ্যাস-আচার-সংস্কার আর সেই গ্রামকে ঘিরে থাকা সুবিশাল বৃক্ষরাজি-প্রাণীকুলের জীবনের কথা বলা হয়েছে পাতায় পাতায়। অমিয়ভূষণ মজুমদার উপন্যাসের শুরুতেই বলে নিচ্ছেন ‘বিচ্ছিন্নতাকে চোখের মণির মতো রক্ষা করে’ এই গ্রামের অধিবাসীরা। বোঝাই যাচ্ছে, দুনিয়ার তাবৎ আয়োজন-আধুনিকতা থেকে এই গ্রাম বঞ্চিত অথবা বলা ভালো, এখানকার প্রাণবন্ত-বন-জঙ্গল-মানুষ-হরিণ-হাতি-বাঘ-মোষ-গোখরো-বনস্পতি কেউই এই আধুনিকতা চায় না। ইলেকট্রিকের উজ্জ্বল তার, লরি-ট্রাক-বাস, পীচ-সড়ক-আধুনিকতার সব আগমনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সংগ্রামে সদা-লিপ্ত এখানকার নদী-নালা-ডোবা-দহ-জীবজন্তু-মানুষ।
আরো অনেক লড়াই হাজির হয় ধীরে ধীরে এই উপন্যাসে। বন ও ক্ষেতের লড়াই, আধিয়ার ও গিরিগৃহস্থের লড়াই, আসফাক ও জাফরুল্লার লড়াই, সামন্ত ও আধুনিক সমাজের মধ্যকার লড়াই। বন ও ক্ষেতের মধ্যে অবিরাম লড়াই চলতে থাকে। বন দখল করে মানুষ তার লাঙ্গল-ট্রাক দিয়ে, অন্যদিকে বনও তার সমস্ত শক্তিমত্তা দিয়ে ক্ষেত প্রতিরোধ করতে চায়। একবার বন জিতে তো আরেকবার ক্ষেত জয়ী হয়। এ দ্বৈরথে অধিকাংশ সময়ই জিতে যায় ক্ষেত, লাঙ্গল, মানুষ। এই মানুষ, ক্ষমতাবান জাফরুল্লার মতো গুটিকতক মানুষ-গিরিগৃহস্থ।

আটশ বিঘা সম্পত্তির মালিক জাফরুল্লা ব্যাপারির চার বউ, অনেক চাকর-বাকর, গরু-মহিষ, বাথান, এমনকি বনেরও মালিক জাফরুল্লা। তার অধীনে কাজ করে আসফাক, চাউটিয়া, ছমির, সাত্তার, সোভানসহ নামহীন-গোত্রহীন আরো অনেক মানুষ।

চরিত্রগুলোর নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মহিষকুড়া, তুরুককাটা, ভোটমারিসহ নানা গ্রাম থেকে ততোদিনে বনকেন্দ্রীক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীরা উচ্ছেদ হয়েছে। অমিয়ভূষণের মনোযোগের বিষয় এখন নতুন করে বসতি স্থাপনকারী অধিবাসীরা-তারা গুণগতভাবে আগেকার আদি বাসিন্দাদের মতোই অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু জীবন নির্বাহ করে। মহিষকুড়ার বন-জঙ্গল-মানুষের মালিক-মহাজন এক জাফরুল্লা ব্যাপারি, তার ইশারায় সবকিছু নড়েচড়ে।

এই উপন্যাসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্রিটিশ শাসন শেষ হবার পরের সময়-পরিধিতে ব্যাপ্ত। তবে এখানে বর্ণিত গ্রাম মহিষকুড়াকে পুরনো অনেক গ্রামের সাথে রদবদল করা যাবে। বিশেষ করে, প্রথম দিককার মহিষকুড়ার বর্ণনার সাথে পুরনো বাংলার গ্রামের মিল পাওয়া স্বাভাবিক। কোচবিহার শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অমিয়ভূষণের পক্ষে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের জন্য বেগ পেতে হয়নি। তবে, অধিকাংশ স্থানেই মার্জিত বাংলা ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে।

কাহিনীটা শুরু হয় এক নাটকীয়তার ভেতর দিয়ে। দশ বছর আগের এক কাহিনীর বয়ান দিয়ে যায় জাফরুল্লার বাপ ফয়েজুল্লার আমলের চাকর চাউটিয়া। সে-সময় এক বুনো মোষ ফয়েজুল্লার বাথানে ঢুকে পড়েছিল। ফাঁদ পাতায় দক্ষ চাউটিয়া বর্মণ সে যাত্রায় কৌশলে ফয়েজুল্লার বাথান রক্ষা করে। পাহাড় সমান উঁচু বুনো মোষটার বর্ণনা আসফাকের মনে দাগ কাটে গভীরভাবে। একসময় আসফাক স্বপ্নে দেখে সে নিজেই বুনো ষাঁড় হয়ে গেছে। বাস-বিকই, আসফাকের ক্ষমতা বা ‘পায়োর’ দরকার সেই বুনো ষাঁড়ে মতোই। জাফরুল্লার সবচেয়ে ছোট বিবি কমরুনের সাথে আসফাক ঘর-সংসার করতে চেয়েছিল। কিন্তু আসফাকের মনোবাঞ্ছা পূরণ হয় না। অথচ কমরুন বিবিকে সে-ই এই বাথানে নিয়ে এসেছে। আসফাক ভেবেছিল বোধ হয় এটাই ঠিক। আসফাক এখন জোয়ান হয়েছে। ‘দেখেক কুমর এলা মুই সিয়ানা হইছং। তোর মাথা ছাড়ি উঁচা’, কমরুন বিবিকে আহ্বান জানায় সে। আসফাক আফসোস করে তার গাবতান-মাদি মোষ না থাকার কারণে, থাকলে সে ঠিকই কমরুনের সাথে সংসার করত।

জাফরুল্লার ক্ষমতার সাথে সে পেরে ওঠে না। নিজের ঔরষের ছেলে মুন্নাফকে সে তার নিজের ছেলে হিসেবে দাবি করতে পারে না। মুন্নাফও মালিকের মতো আচরণ করে। ‘মিঞা সাহেব’ সম্বোধন পরিবর্তন করে আসফাকের নাম ধরে ডেকে ওঠে। প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে ওঠে আসফাকের। ওষুধ আনতে দেরি করে, বাঁশের চটি তোলে না, গরু-মোষ ঠিকঠাক উঠল কিনা দেখে না, না-ঘুমিয়ে সারারাত উঠে উঠে জাফরুল্লার অন্দরমহল পাহারা দেয় না। এভাবেই আসফাক প্রতিশোধ নেয়, তৃপ্তি পায়, আবার ভয়ও পায়। অন্ধকারের মুখোমুখি আসফাক বলে ওঠে, ‘তো ব্যাপারি। তোমরা থাপ্পড় মারছেন, দশ বিঘা ভুঁই দিছেন, মুইও চাষ দেং নাই। মুই ওষুধ আনং নাই, তোমরাও না-মরেন। তামাম শুধ।’ জাফরুল্লা আসফাককে দশ বিঘা ডোবা জমি দিয়েছিল। কিন্তু সে চাষ করতে পারেনি, তার একার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সে এখন এটাকে প্রতিশোধের আগুন হিসেবে বিবেচনা করে।

শহরে ওষুধ আনতে গিয়ে আসফাক হারিয়ে যায় বনের মধ্যে। ‘ভুলুয়া’র কবলে পড়ে পথ হারিয়ে সে দিক-বিদিক ছুটতে থাকে। ভীষণ ভয় পায়, ঘোর তৈরি হয়। একসময় মনে হয় আসফাক বুনো ষাঁড় হয়ে গেছে। বুনোটার মতোই ডাকতে থাকে ‘আঁ-আঁ-ড়’। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, অমিয়ভূষণ আরেক কথাশিল্পী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের জাদুবাস্তববাদের সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বুনো মোষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আসফাকের বেশ কয়েকবার ঘটে। আসফাকের জীবনের সমস- বিষয়ই মোষকে কেন্দ্র করে। একটা গাবতান মোষের জন্য কমরুনকে না পাওয়ার বঞ্চনা, অন্যদিকে জাফরুল্লার বাথানে মোষের দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপর। জীবিকা আর বঞ্চনা-দুটোই আসফাককে তাড়িয়ে মারে বারবার।

স্বপ্নে ষাঁড় হয়ে গেলেও কোনো লাভ সে বাস্তবে দেখে না। ‘সব বনই কারো-না-কারো-যেমন সব জমিই কারো-না-কারো। হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য তুমি বুনো ষাঁড়-মোষ হতে পার, এই বন আর বনের নয়, তাও অন্য একজনের।’ আসফাকের হয়ে কথক এটা বলে দেয়। আসফাকের মালিক জাফরুল্লা। বনের মালিকও সে। ফলে ষাঁড় হয়ে স্বাধীন হতে চাইলেও আসফাক কোনো আশা দেখে না। আসফাক স্বাধীনতা পায়নি। সারাজীবনের জন্য আবদ্ধ সে জাফরুল্লার বাথানে।
ভারতের আকাদেমী পুরস্কার পাওয়া এই উপন্যাসে আধিয়ারদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কথা এসেছে। তবে তা ছাড়া ছাড়া, অল্পপরিসরে। অমিয়ভূষণের উদ্দেশ্য হয়ত আধিয়ারদের লড়াইয়ের কথা বলা না। কিন্তু আরো বিস্তৃত পরিসরে উপন্যাসটি লেখা হলে লেখক সে-বিষয়টাকে এড়াতে পারতেন না। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একটা গ্রাম মহিষকুড়া আর সেখানকার মানুষের ছবি আঁকাই লেখকের মূল উদ্দেশ্য। আবার কোনো কোনো জায়গায় মনে হতে পারে, উপন্যাসটি আসফাক ও কমরুনের প্রেম কাহিনির বর্ণনা।

উপন্যাসের শেষের দিকে দেখা যায়, জাফরুল্লা ব্যাপারি একটা বিশাল ট্রাক নিয়ে আসে। বুনো মোষের জায়গা দখল করে আধুনিক কলের মোষ। আসফাক এই ট্রাকটাকে কলের মোষ হিসেবেই সম্বোধন করে। মানুষ সমান উঁচু কলের মোষের সঙ্গে কোনো মোষেরই লড়াই-জেতার ক্ষমতা হবে না। সে যতো দেখে ততোই অবাক হয়। এখানে, সেই মহিষকুড়া গ্রামের আধুনিকতার দিকে যাত্রা শুরু। গল্পেরও শেষ হয় এখানে।

(https://www.somewhereinblog.net/blog/ranaraihan1/29007673)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here