হাসান আজিজুল হকের গল্পে মুক্তিযুদ্ধ

0
1150

হারুন  পাশা।।

বাংলা ছোটগল্পের রাজপুত্র হিসেবে খ্যাত হাসান আজিজুল হক (জন্ম  ১৯৩৯-) । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে  বাংলা ছোটগল্প জন্ম  নিয়ে বর্তমানে তা কী বর্ণিল-বিচিত্র-নানা  ভঙ্গিময়  হয়ে  উঠেছে হাসান আজিজুল হকের গল্প  না  পড়লে তা বোঝার কোন উপায় নেই। তিনি গল্পকে  নির্মাণ করেছেন নিজের  মতো করে, আর  তাতে রয়েছে  বাস্তবতার প্রলেপ। গল্পের পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে চেনা-জানা, প্রতিদিনের  নানা ঘটনার এক  শক্তিশালী  অবয়ব  দ্বারা,  যার  ফলে   গল্প  হয়ে উঠেছে সজীব  ও ধারণ করে আছে প্রাণময়তা। গল্পে বৈচিত্র্যময় বিষয়ের  মধ্যে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ লেখকের চেতনালোকে গভীর নাড়া দিয়ে, গল্পের  বিষয়  হিসেবে জায়গা  করে নেয়, যেখানে  তাঁর  প্রত্যক্ষ  অভিজ্ঞতাই  মুখ্য।

এখানে একটু বলে রাখা দরকার- ইতিহাসবিদ আর সাহিত্যিক দুজন ভিন্ন পরিবেশের। ইতিহাসবিদ সবকিছুকে ইতিহাসের আবরণে ঢাকতে চান, আর সাহিত্যিক সেই ইতিহাসকে সাহিত্যের মর্যাদা দিয়ে জীবন্ত ও প্রাণোচ্ছ্বল করে তোলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে হাসান আজিজুল হক সাহিত্যের ধ্যান-খেয়ালে ফেলে- ইতিহাসের রস নিয়ে তাকে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব গল্প-কাঠামোয়। পুরোপুরি ইতিহাস রক্ষিত হয়নি,  তবে ইতিহাসের টুকরো-টাকরা বাস্তবনিষ্ঠ বিবরণ বলিষ্ঠতার সাথে উঠে এসেছে। গল্পে মুক্তিযুদ্ধের যে নানা ঘটনার বিবরণ জায়গা পেয়েছে, সেই বিবরণ ও ইতিহাসের সাথে কিছু বিষয়ের সাদৃশ্য এবং যুদ্ধ-পরবর্তী মানুষের হতাশার রূপটি দেখানোর প্রয়াস রয়েছে প্রবন্ধটিতে।

গল্পগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, বেশকিছু গল্পে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর  তথা  মার্চ মাস থেকে শুরু করে ডিসেম্বর মাসের বর্ণনা উঠে এসেছে। এ সময়ে পাক-সেনাদের চালানো  হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, যুদ্ধের তা-বে অস্থির লোকদের নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে জায়গা বদল, কুলোতে না পেরে অত্যাচারী পাক-সেনাদের লজ্জাজনক পলায়ন প্রভৃতি বিষয় হয়েছে মূল উপজীব্য। আর কিছু গল্প যুদ্ধ-পরবর্তীকালের চালচিত্র বা মুক্তিযোদ্ধাদের, সাধারণ জনগণের যে স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতাকে ঘিরে, সেই স্বপ্নভাঙার আর্তনাদে ভরা। প্রথম ভাগে আসে যে গল্পগুলো, সেগুলো হলো- ‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পগ্রন্থের- ‘ভূষণের একদিন’, ‘কৃষ্ণপক্ষের দিন’, ‘আটক’। ‘আমরা অপেক্ষা করছি’ গল্পগ্রন্থের ‘মাটির তলার মাটি’। ‘রোদে যাবো’ গল্পগ্রন্থের- ‘ঝড়’, ‘নবজাতক’। দ্বিতীয় ভাগের গল্পগুলো হলো- ‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পগ্রন্থের- ‘কেউ আসেনি’, ‘ফেরা’, ‘ঘরগেরস্থি’।                        

২.

দেশ  বিভাগের  পর এদেশের শাসনভার পাকিস্তানি সরকারের হাতে পড়লে-  তারা মেতে উঠে দেশকে নিয়ে এক দাবা খেলায়। কিন্তু এদেশের মানুষ তাদের  নানা  চক্রান্তের বেড়াজাল ও খেলার  মহড়াকে  ভাঙতে  নামে  রাজপথে- মৃত্যুকে  হাতের  মুঠোয়  নিয়ে। মানুষকে রক্তাক্ত  হতে  হয়  ১৯৫২ সালের  ২১  ফেব্রুয়ারিতে,  তবু  পিছুটান  ছিল  না  বাঙালি জাতির,  নির্ভীক  বীরের  মতো  বলিষ্ঠতা ও আত্মবিশ্বাসের  উপর  পা  দিয়ে  এগোতে  থাকে। এরপর  দেশে  মুক্তিযুদ্ধ  শুরু হলে  আপামর  জনতা  অসীম  সাহসের  সাথে, নিজেদের কোমল হাতে  অস্ত্র  তুলে  নিয়ে- এদেশ থেকে তাড়ায়  পাকিস্তানি  শাসক  নামক  শোষক,  অত্যাচারীদের।

দেশভাগ, ভাষা-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান  এসবের  পথ  পাড়ি  দিয়ে আসে যেমন মুক্তিযুদ্ধ, তেমনি লেখকের  অভিজ্ঞতায়  যুক্ত  হয়  এক নতুন  অধ্যায়। ‘যুদ্ধ  চলাকালে দেশের অভ্যন্তরে  অবস্থান  করে  খুব নিকট থেকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে যে অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেন তারই রক্তাক্ত ফসল’(১) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগুলো। মুক্তিযুদ্ধের  সময় ঘটে  যাওয়া  ঘটনা  লেখককে  দেয়  শারীরিক-মানসিক  কষ্ট  ও  যন্ত্রণা। এমন যন্ত্রণা  থেকে  মুক্তির  জন্য-  তিনি আশ্রয় বা ভর  করেন লেখনীর  উপর। নিজের  বৈচিত্র্যময়  বাস্তব অভিজ্ঞতাকে  লেখায়  বা  গল্পে  জায়গা  দিয়ে,  আমাদের  পরিচয়  করিয়ে  দেন- যুদ্ধের  বাস্তব  পরিবেশের সাথে, পাকিস্তানি সেনাদের প্রাণহীন বর্বর  আচরণের  সাথে।

এখন গল্পগুলোকে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে দেখানোর প্রয়াস থাকবে লেখক মুক্তিযুদ্ধের যেসকল উপাদান গল্পে ব্যবহার করেছেন সেগুলো। আর সেখান থেকে বাদ যাবে না যুদ্ধ-পরবর্তীকালে মানুষের ভেতরে জমানো হতাশা ও নৈরাশ্য।

‘ভূষণের একদিন’ গল্পটি এপ্রিল মাসের যুদ্ধের বর্ণনাকে ঘিরে রচিত, এই  গল্পটিতে প্রমাণ মেলে পাকিস্তানিদের বাস্তব রূপের । যে সময়টি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময়। ভূষণের  চোখে  ধরা  পড়া  পাক-সেনাদের  নারকীয়  হত্যাযজ্ঞের  চিত্র বাস্তবতার  প্রান্তকে ছুঁয়ে যায়।    সে দেখে, পাক-সেনাদের  চালানো বুলেটের আঘাতে কোন মানুষের মাথা, কারো পা, কারো কাঁধ, বুক বা পেট থেকে ফিনকি দিয়ে  রক্ত বের হচ্ছে। দলে দলে মানুষ মাটিতে শুয়ে পড়ছে। জীবন বাঁচানোর জন্য মানুষ পালাতে থাকে, কিন্তু পালাতে বা  নিজেকে আড়াল করতে  পারে  না, তলপেট চেপে ধরে  বসে পড়তে হয়। রক্ত ছোটে  কলকল শব্দে, ডগায় লেগে থাকা  রক্তবিন্দু নিয়ে  ঘাস  দুলতে  থাকে।  বস্তার  মতো  মানুষের  ওপর  মানুষ স্তূপীকৃত  হতে থাকে।  কারো  হাত-পা  নড়ে, কারো চোখের পাতা কাঁপতে কাঁপতে স্থির  হয়ে  যায়। কেউ কেউ  হাত-পা  ছুঁড়ে  চিৎকার  দিয়ে ভগবানকে  ডাকে,  আর  পানি  চায়।

অজস্র মানুষ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কেউ কেউ এখনো চিৎকার করছে, ভগবানকে ডাকছে

পানি চাইছে, হাত পা ছুঁড়ছে।(২)

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রমাণ বহন করে এমন বর্ণনা বা চিত্র। সে সময় মানুষ পানি চাই, পানি চাই বলে চিৎকার করেছে, কিন্তু পানি পায় নি।

‘এই গল্পে প্রতিরোধ নয়, যুদ্ধ শুরুর প্রথমাবস্থায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের স্থান পেয়েছে তবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ভূষণের প্রতিবেশী গ্রামের তিনটি ছেলের কথায়। ভূষণের সাথে বাক্য বিনিময়ে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।’(৩) ছেলে তিনটি ভূষণকে যুদ্ধে অংশ নিতে আহ্বান করে, দেশের যে ছয় কোটি মানুষ আছে- তাদের মধ্যে  চাষীরাও অন্তর্ভুক্ত , তাই ভয়ে আঁতকে উঠলে চলবে না। এদেশের মানুষকে পাকিস্তানিদের শোষণ-অত্যাচার মুক্ত বাতাস উপহার দিতে- যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে, লুকিয়ে বাঁচার উপায় নেই-

তোমরা ভয় পেলে কোন কাজই হবে  না। তোমাদেরই  তো অস্ত্র  ধরতে  হবে। তোমরাই  তো ছ কোটি মানুষ আছো এদেশে-এই তোমরা যারা চাষী-জমিজমা চাষাবাদ করো। আমাদের দেশটা শুষে খেয়ে ফেললো শালারা। ভাল ভাল অস্ত্র দিয়ে ঢাকায়  খুলনায়  সব  জায়গায়  আমাদের  মেরে  মেরে  শেষ  করে  দিলো । অস্ত্র  না চালালে     এখানেও  আসবে  ব্যাটারা। লুকিয়ে  বাঁচবে  ভেবেছো ?(৪)

এই পরিকল্পার গভীরতর রূপ পাওয়া যাবে ‘কৃষ্ণপক্ষের দিন’ গল্পে, যেখানে ছাত্র-কৃষক-ক্ষেতমজুর দল গঠন করে যুদ্ধে অংশ নেয়।

‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পটিও ধারণ করে আছে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক-সেনাদের নির্যাতনের নানা দিকগুলোকে। নারী  অপহরণের একটি চিত্র উঠে এসেছে এ গল্পে। লোকটি পথ চলতে গিয়ে ফস করে জ্বলা দেশলাইয়ের আগুনে- ‘একজন  বিজাতীয় মানুষের নিষ্ঠুর মুখ এবং একটি মুখবাঁধা স্ত্রীলোকের অবয়ব’ দেখতে পায়। সে এগিয়ে যেতেই কেউ লাফ দিয়ে জিপে ওঠে এবং জিপ তীব্র গতিতে চলে যায়। বাস্তবিকই যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরে নিয়ে যেত নারীদের। পাঞ্জাবি সেনারা রাজাকার ও দালালদের সাহায্যে রাজধানীর  স্কুল,  কলেজ,  বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং অভিজাত জনপথ থেকে বহু বাঙালী যুবতী মেয়ে, রূপসী  মহিলা  এবং সুন্দরী  বালিকাদের জীপে, মিলিটারি ট্রাকে করে পুলিশ লাইনের বিভিন্ন ব্যারাকে জমায়েত করতো।(৫)  আর তাদের উপর চালানো হতো অকথ্য নির্যাতন, নির্যাতীতদের আর্তনাদ ও আহাজারিতে কেঁপে ওঠত বাংলার বাতাস।

পাকিস্তানি  সেনারা  এদেশের  সশস্ত্র  সিপাহীদের  ধরে  নিয়ে  এলোপাতাড়ি  পেটাতো।  বলত- শালা মালাউমকা  বাচ্চা,  হিন্দুকা  লাড়কা, শোয়রকা  বাচচা  শালা  তোমহারা  মুজিব  বাবা  আভি  কাহা  হায়, শালা  হারামি  আভি  শালা  জয়বাংলা  বোলতা  না-ই।(৬)  এ  গল্পে  একজন বন্দীকে  বলা  হয়  সে  হিন্দু কি-না?  ‘জয়বাংলা   কাঁহা  হ্যায়’?…‘শালা  মুজিবকা  পূজারী।’  তার  উপরও  চালানো  হয়  নির্যাতন- যা ধরা পড়ে পথ চলা লোকটার  চোখে। সে  দেখে,  বন্দীকৃত  কালো  প্যান্ট  পরা  লোকটার  মাথা  নিচ দিকে  দিয়ে- পা  দুটি  এক  সঙ্গে  বেঁধে  রডে  আটকে  কপিকলের  মতো  টান  দিয়ে  ওপরে  ওঠাচ্ছে-নামাচ্ছে। লোকটার  মুখ  থেকে  ঘড়ঘড়  আওয়াজ  বের  হয়,  যাকে  কথায়  পরিণত  করে  বলে-‘বাঙ্গালি তুমলোগোকে  খতম  করেগা  আভি  ভাগ  যাও  বাঙ্গাল  মুল্লুকসে।’(৭) এই  কথা  শেষ  হতে  না  হতেই  কাঁচা মাংস  থ্যাঁতলানোর  আওয়াজ  পাওয়া  যায়।

আর গল্পের শেষ হয়েছে লোকটির পাকিস্তানি সেনাদের কবলে প্রাণ দেওয়া স্ত্রী-পুত্রের করোটি ও অস্থির সন্ধানের ভেতর দিয়ে, যেগুলো  ছিল মাটির নিচে।

‘কৃষ্ণপক্ষের দিন’ গল্পটি সম্পর্কে  ড. স্বপ্না রায় তাঁর এক প্রবন্ধে বলেন- ‘রাজাকারের হাতের রাইফেল ছিনিয়ে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে  পাঁচজন গেরিলা যোদ্ধার পলায়নপরতার বিবরণ রয়েছে গল্পের গোটা অংশজুড়ে।’(৮) যা ঠিক কথা নয়, কেননা রাজাকারদের কাছ থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা গল্পের ক্ষুদ্র অংশের বিবরণ, যা মূল বিষয় হতে পারে না। বরং গল্পটিতে  উঠে এসেছে যুদ্ধকালীন বর্ণনার পাশাপাশি প্রতিরোধের কথা। বাস্তবতার আলোকেই যেন লেখক নির্মাণ করেছেন গল্পটিকে। আপামর জনতা যে সেদিন যুদ্ধে অংশ নেয় দেশকে স্বাধীন করার জন্য, তার ইঙ্গিত এ গল্পের চরিত্রগুলোর পেশার বৈচিত্র্যে  প্রকাশিত-

                               ক. জামাল ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছে।

                               খ. শহীদ কলেজ ছেড়ে এসেছে।

                               গ. একরাম এসেছে স্কুল ছেড়ে।

                               ঘ. মতিয়ুর ক্ষেতমজুর।

                               ঙ. রহমান  চাষী।

ইউনিভার্সিটি-কলেজ-স্কুল পড়ুয়ারা, ক্ষেতমজুর-চাষী  তথা  সকল পেশার লোকেরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, তাই চিত্রিত হয়েছে।

পাক-সেনারা এদেশে চালায় লুণ্ঠন, হত্যা আর ধর্ষণকার্য। যুদ্ধকালীন ধর্ষিত মেয়েদের লাশ দেখে মনে  হয়েছে,  তাদের  হত্যা  করার  পূর্বে  তাদের  স্তন সজোরে টেনে  ছিঁড়ে ফেলা  হয়েছে, যোনিপথে লোহার  রড  কিংবা  বন্দুকের  নল  ঢুকিয়ে দেওয়া  হয়েছে। যুবতী  মেয়েদের যোনিপথের এবং পিছনের মাংস যেন ধারালো  চাকু দিয়ে কেটে  এসিড দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া  হয়েছে।(৯) এমন কোন নির্যাতন নেই যা নারীরা মুখ বুজে-পরিস্থির শিকার হয়ে সহ্য করে নি। এ গল্পে ধর্ষণ ও ছিন্নভিন্ন যোনির চিত্র উঠে এসেছে। জামিল দেখে, তিন- চারজন পাক-সেনা একজন মেয়ে লোককে উলঙ্গ করেÑধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশে খালের মধ্যে ফেলে- তাকে ধর্ষণ করছে। ধর্ষণ করেই ক্ষ্যান্ত নয়, তার যোনিপথ বেয়েনেট দিয়ে ছিন্নভিন্ন করেছে-

তার যোনি বেয়েনেট দিয়ে ছিন্নভিন্ন করা।… তার বিশাল নগ্ন নিতম্বদেশ…ফুটিফাট লাল মাংসের ফাঁকে ফাঁকে সাদা চর্বি।(১০)

পাক-সেনাদের হত্যাকৃত মানুষগুলোর লাশ চারদিকে ছড়ানো- বিলের কিনারায় কিনারায় মরা দেহগুলো  ভাসছে। লাশগুলোর মধ্যে অনেকের দেহ কোমর সমান পানির নিচে, কেউ ঘাড় দুমড়ে পানির নিচে, কারো পায়ের পাতা পানির নিচে, অথচ খিলানের মতো পিঠ উঁচু হয়ে আছে। কেউ উলঙ্গ অবস্থায় আঁকাশির মতো পা উঁচু করে আছে। আর এরা সকলেই রয়েছে চেয়ে।

যুদ্ধের  সময় মৃত লোকদের জানাজা দেবার সুযোগ হয় নি, তাই সেই লাশগুলো খেয়েছে শেয়াল, শকুন, কুকুরে। যার একটা মূর্তি রূপলাভ করেছে এ গল্পে। জামিল বলে-

আমার বাবার লাশ তিনটে শকুনে ছিঁড়ে খাচ্ছে। একটা বসেছিল তাঁর পেটের উপর। পেটের গর্তের ভিতর মাথা ঢুকিয়ে সাপের মতন ঘাড় নাড়িয়ে নাড়িয়ে নাড়িভুড়িঁ টেনে টেনে বের করছিল। আর একটা চোখ উপড়ে নিচ্ছে। তিন নম্বরটা মাথা  ঢুকিয়ে দিয়েছিল বুকের খাঁচায়। আশপাশে অনেকগুলো চ্যাঁচাছিল তখন।(১১)

তিনটা  শকুন জামিলের বাবার দেহকে খুবলিয়ে খায়। একটা  পেটের উপর বসে নাড়িভুড়ি টেনে বের করে, একটা চোখ তুলে নেয়, একটা  ছিন্নভিন্ন  করে  বুকের  খাঁচা। যুদ্ধের সময় জামিলের বাবার মতো হাজারো লাশের দশা মাটি দেবার অভাবে এমন হয়েছিল।

মুক্তিযোদ্ধারা যে জায়গায় আশ্রয় নেয় তার সন্ধান পেয়ে পাক সেনারা সেখানে হামলা করে, তাদের না পেয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয় গ্রাম-ঘরবাড়ি। মুক্তিযোদ্ধা শহীদের জবানিতে যার প্রমাণ মেলে- ‘হারামজাদা শয়োরের বাচ্চারা আমাদের না পেয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে গাঁয়ে।’(১২) যে গ্রামে তারা আশ্রয় নিয়েছিলো, সেই গ্রাম থেকে চলে আসায়- পাকিস্তানিরা তাদের  না পেয়ে, পুরো গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকাররা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে পাক-সেনাদের সহায়তা করে, সেই রাজাকারদের কথাও উঠে এসেছে এ গল্পে। একরাম যাকে হত্যা করে। আর হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হয় নি- রাইফেলটি নিজের করার জন্য ছুটে যায়, যদিও তার পরিণতি হয় মৃত রাজাকারের মতোই-

সাহস বটে একরামের; হাতের টিপ হয়েছিল মারাত্মক-রাজাকারটাকে এক গুলিতে ঘায়েল তো করলই, রাইফেলটা বাগানোর জন্য কেমন ছুটে গেল।(১৩)

কাউকে এ দেশের বুকের উপর বসানো বা মালিক বদলানো- জামিলদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য নয়, তাদের  উদ্দেশ্য পাক-সেনাদের বীভৎস গণহত্যা  আর লুঠতরাজ বন্ধ করে- তাদের এ দেশ থেকে তাড়িয়ে- দেশকে গণমানুষের হাতে তুলে দেওয়া। এজন্য তাদের যুদ্ধ করতে হবে, পাক-সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে, লড়তে হবে শেষ পর্যন্ত। বন্ধুক চালানো বা না চালানো, হাঁটা বা ঘুমানো যে অবস্থায় থাকুক না কেন- সবসময়ই তাদের সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হবে- পাকিস্তানিদের এ দেশ থেকে তাড়াতে।

সবসময় লড়ে যাওয়া-বন্দুক যখন চালাচ্ছি এবং যখন চালাচ্ছি না তখনও লড়ে যাওয়া- যখন হাঁটছি          ঘুমোচ্ছি বা কথা বলছি, তখনও, তখনও-একেবারে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া।(১৪)   

‘আটক’ গল্পটিতে দেশ স্বাধীন হবার দিন-ক্ষণেক পূর্বের বর্ণনা স্থান পেয়েছে। ভুটান ও ভারতের সহায়তায় যুদ্ধবিমান আক্রমণে পর্যুদস্ত পাক-সেনারা দ্বিগি¦দিক ছুটতে থাকে, পালাতে থাকে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে-

গতকাল সন্ধ্যে থেকে শুরু হয়েছে সেনাবাহিনীর পিছু হটা। সারারাত অন্ধকারে কারফিউর মধ্যে ভারি সাজোয়া গাড়িগুলো ফিরেছে। গম্ভীর দুমদুম শব্দ করে ফিরেছে বড়বড় ভ্যানগুলো। প্রথম দিকে হেডলাইট জ্বালানো ছিল, তীব্র বেগে অন্ধকার কেটে ছুটে গেছে আলো, রাস্তার দুপাশে আলো পড়তেই গাছগুলো ম্রিয়মাণ,ঠিক ঝলসে যাবার মতো। রাত বাড়তে কুয়াশা বাড়তে হেডলাইটগুলোর আলো আর এগোতে পারে না। ইঞ্জিনগুলো যেন গাড়িগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য নয় বরং হেডলাইটগুলোর আলোগুলোকেই এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে অমন কষ্টকর পরিশ্রমের ঘর্ঘর আওয়াজ দিচ্ছে । শেষ পর্যন্ত তারা হেডলাইট নিভিয়ে দিয়েছিল; পিছু হঠছিল অন্ধকারের মধ্যে।(১৫)

যে পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল একসময় বলবান- দেহের জোরে খুন ধর্ষণ সবই চালিয়েছে, বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় নাচিয়েছে নিজেদের,  সেই সৈন্যদের মধ্যে যেন নেই আজ কোন বুদ্ধির ছাপ। দেহে পাশবিক নিষ্ঠুরতার চিহ্ন থাকলেও শকুনেরা আজ পরিণত হয়েছে মেদী বিড়ালে। নজমুলকে সামনে পেয়েও খুন করছে না- এখন পরাজয় আসন্ন এবং নিশ্চিত জেনে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে তারা ব্যস্ত। হয়ে পড়েছে ক্লান্ত, রাইফেল হাতে শোভা পায় শিথিলভাবে- 

এরা খুবই ক্লান্ত; সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, নিজের নিজের হেলমেট এরা হাতে ধরে আছে, রাইফেল ধরে আছে খুবই শিথিল ভাবে।(১৬)

 পাক-সেনারা ছোট  ছোট দলে বিভক্ত  হয়ে  ঝোপঝাড়ের আশেপাশে ঘোরাফেরা  করছে। অনেকেই ঝোপের ছায়ায় ক্লান্তভাবে আধশোয়া হয়ে আছে। কেউ বন্দুক মাটিতে রেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। মুরগী যেমন খাবার খুঁজতে গিয়ে আস্তাকুঁড়ের মধ্যে ইতস্তত ঘুরে খাবার খুঁজে বেড়ায়-কিছু সৈন্যের দশা সে রকম। তারা একসঙ্গে থাকা সত্তেও  নিজেদের  মনে করছে সঙ্গিহীন। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত ও বিষণ্ন, ‘ভারি ভারি চেহারার অফিসাররা বিব্রত আর হতভম্ব।’গল্পের শেষে দেখা যায় একজন যুবক আটকা পড়ে বিধ্বস্ত ভবনে, বাঁচার চেষ্টা  তার মধ্যে ছিল, কিন্তু পেরে ওঠে না শেষ পর্যন্ত। দেশের সকল জনগণই পাকিস্তানি সৈন্যের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল, কিন্তু বাঁচতে পারে নি, শেষ পর্যন্ত  মৃত্যুকে কবুল করে নেয়।                      

‘মাটির তলার মাটি’গল্পে ৬/৭ ডিসেম্বর ও তার পরের কয়েকদিনের যুদ্ধের বর্ণনা স্থান পেয়েছে। যুদ্ধবিমানের  আক্রমণে পাক-সেনারা পালাতে থাকে নানা জায়গা থেকে। যুদ্ধবিমান তাদের পিছনে ধাওয়া করলে, তারা চোখ কপালে তুলে দৌঁড়াতে থাকে। যারা পায়ে হেঁটে পালাচ্ছিল তাদের  দুর্গতির শেষ নেই। তাদের বুট খুলে যায়-মোজা ছিঁড়ে যায়। প্যান্ট ঢিলা হয়ে নিচে নেমে পড়ে। তাদের দৃষ্টিতে অসহায়ত্বের  ছাপ। তবু তারা পালাচ্ছে, চলে যাচ্ছে দৃষ্টিসীমার বাইরে-  

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ভারী ভারী গাড়ি করে লট-বহর নিয়ে পায়ে হেঁটে পাকিস্তানি সৈন্যরা পালিয়েছে এই এলাকার ভিতর দিয়ে। আর তাদের দেখা যাচ্ছে না।(১৭)                       

শহরে লোকজন নিজেদের নিরাপদ ভাবতে না পেয়ে আশ্রয় নেয় নানা জায়গায়। লেখকও শহর ত্যাগ করে গ্রামে এক কৃষকের বাড়িতে আশ্রয় পায়। যে নয় মাস নিজের উৎপাদিত ফসল দিয়ে দিন পার করতে পারলেও তিন মাস অভাব অনটনে কাটলেও পার হয় দিন। কৃষকটি লেখকদের খেতে দেয় কাঁচকলার সবজি ও ভাত। লেখক যুদ্ধের সময় মিখাইল সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলেন- তাদের খেতে দিয়েছিলো কাঁচকলার সবজি। মিখাইলের বাবা বলে-

এসব খাবার আপনারা খেতি পারেন না তা আমি জানি। যুদ্ধ চলতিছে, কাঁচকলার কাঁধিটে ভাগ্যিস বিক্রি হয়ে  যায়নি, তাহলে শুধু ডাল দিয়েই খেতে হতো আপনাদের। কি খাতি  দিছি, ভাবতে গেলেই শরম পাই।(১৮)

লেখক তাঁর নিজের  তথা বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই জুড়ে দিয়েছেন।  যুদ্ধে কৃষকের ছেলে শহীদ হয়। দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, নিজের ছেলেকে উৎসর্গ করে দেশপ্রেমী বাবা।

‘ঝড়’ গল্পে যুদ্ধের সময় লোকদের স্থান পরিবর্তন ও পাশবিক অত্যাচারের চিত্র ফুটে উঠেছে। সেনারা শহরে আগুন লাগিয়ে দেয়, দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের আলোয় অন্ধকার রাত দিনের মতো পরিষ্কার হয়ে উঠে। চারদিক থেকে ভেসে আসে ধোঁয়া আর জিনিসের পোড়ার গন্ধ। রাতারাতি মানুষ জিনিসপত্র বেঁধে, শিশুকে সঙ্গে নিয়ে, গরু-ছাগলের গলার দড়ি খুলে দিয়ে তারা শহর ত্যাগ করেছে। লেখক বিকালে বাসা থেকে বের হয়ে শহর পেরিয়ে নদীর ঘাটে যায়। নদী  পার হবার সময় ফরিদপুরের কানা মাঝির কাছ থেকে জানতে পায়, শহরের মোড়ে মানুষ মরে পড়ে আছে। ঘিলু ছিটকে পড়ে রয়েছে রাস্তায়- কলকল করে  রক্ত ড্রেন দিয়ে যাচ্ছে। নদী  পার হয়ে লেখক রিকসায় চড়ে- ঝড়ো মেঘের আগমনে আশ্রয় নেয় এক বাড়িতে। যেখানে তাঁর চোখে পড়ে এক উলঙ্গ নারী মূর্তি। যে পাক-সেনাদের নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়। লেখক দেখতে পায়, মেয়েটির যোনি নেই, সেখানে একটি বিরাট গর্ত।

 ..মেয়েটির যৌনি নেই। যৌনির জায়গায় বিরাট একটি গহ্বর।(১৯)

যুদ্ধের সময় নারীরা এমনই পাশবিক অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। ছুরি দিয়ে তার (ধর্ষিত মেয়েদের) স্তন কেটে, পাছার মাংস কেটে, যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ওরা আনন্দ-উপভোগ করত।(২০) বাঙালি মেয়েদের উলঙ্গ অবস্থায় ঝুলিয়ে রেখে ধর্ষণ করেছে পাক-সেনারা, চাকু ছাড়াও মুখ দিয়ে কামড়ে ছিঁড়েছে ধর্ষিতদের স্তন ও যোনি,  নারীরা এমন বেগতিক অবস্থার শিকার হয় যুদ্ধচলাকালীন, লেখক বাস্তবতার আলোকেই গল্পে এমন বিবরণ তুলে এনেছেন। আর শিশুর হাসি যেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে উন্মোচিত করে প্রতীকী ব্যঞ্জনায়।

 ‘নবজাতক’ গল্পটিতেও স্থান পেয়েছে সাধারণ লোকদের নিরাপদ জায়গার জন্য ছুটাছুটি, বিমান আক্রমণের ফলে পাক-সেনাদের পলায়নের বর্ণনা। এ গল্পটি ‘আটক’ ও ‘মাটির তলার মাটি’ গল্পের মতোই। যুদ্ধবিমান আক্রমণে পাক সেনারা  দলে দলে পালাতে থাকে। তাদের  সঙ্গে সাধারণ লোকজনও পালাতে থাকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। সেনাদের উপর বৃষ্টির মতো বর্ষিত হয় বোমা-

অনেক দূরের রাস্তা দিয়ে পিল পিল করে লোকেরা পালিয়ে যাচ্ছে সৈনিকরা সোজা দক্ষিণ দিকে পালাচ্ছে। জীপ, ট্রাক, মিলিটারি ভ্যান আর ট্যাংকের ঘর্ঘর শব্দে এতদূর থেকেও কানে তালা ধরে যাচ্ছে এক ঝাঁক প্লেন উড়ে এলো। রাস্তার পশ্চিম দিকে তিনবার বোমা পড়লো।(২১)

যুদ্ধের সময় অনেক মায়ের  সন্তান হয়েছে, তেমনই একটা  চিত্র উঠে এসেছে এ গল্পে। লেখক সন্তান প্রসবরত এক মায়ের  চিৎকার শুনতে পায়। সে বলছে, ‘আমার সন্তান হবে-আমাকে বাঁচাও বাবা…আমাকে বাঁচাও।’(২২) সন্তান প্রসবের বেদনা থেকে নিজেকে বাঁচানোর আকুতির প্রকাশ ঘটে তার ঐ চিৎকারে। নবজাতকের জন্ম যেন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের প্রতি ইঙ্গিত।

৩.

‘কেউ আসে নি’ গল্পে যে বিষয়টি শক্ত মাটি পায় তা হলো- যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীন দেশের প্রতি বিরক্ত প্রতিক্রিয়া। ‘যে স্বপ্ন-কল্পনা,আশা-আকাক্সক্ষা ছিল ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে ঘিরে তার বাস্তবায়নের অভাব মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশাগ্রস্ত করে।’(২৩)  যুদ্ধ শেষ স্বাধীন দেশে গিয়ে গফুর ধান কাটবে কিন্তু  তার নিজের কোন জমি নেই। যুদ্ধের  আগে সে অন্যের জমিতে দিন মজুর হিসেবে কাজ করেছে, এখন দেশ স্বাধীন হয়েছে, এই স্বাধীন দেশে কী তাকে দিনমজুর হিসেবে খাটতে হবে? না অন্য উপায় আছে এমন প্রশ্ন রাখে।

তার নিজের তো কোন জমি নেই। যুদ্ধের আগে সে কামলা খাটত।এখন সে বাড়ি গিয়ে কি করবে।

           দেশ  তো স্বাধীন হয়ে গেল; এখন ধান কাটা শুরুর মানে কি? সে কি আবার গিয়ে কামলা খাটবে

 রাইফেল  ফেরত দিয়ে? না কি অন্য ব্যবস্থা কিছু হবে?(২৪)

বাস্তবতায়  পা  রাখতেই  তাকে এমন হতাশা পেয়ে বসে। খেতে না পেয়ে তার বউ চলে যায় যুদ্ধের আগে, এখন দেশ স্বাধীন। কিন্তু তার সে অবস্থার পরিবর্তন হলো কোথায়? সে দিনমজুরই থেকে যায়। বিলে এক কেজি ওজনের চিংড়ি ধরার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু তার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট।

 ঠ্যাং হারিয়ে আসফ হাসপাতালে মৃতপ্রায়। বাইরে দেশ স্বাধীন হয়েছে তাই আনন্দ-মিছিল হচ্ছে। কিন্তু কেউ দেখতে আসে নি আসফকে। তাই তার আক্ষেপ দানা বেঁধে ওঠে মনের ভিতর। যে দেশের জন্য-দেশের লোকের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য-দেশকে পরাধীনতার হাত থেকে রক্ষার জন্য,  যুদ্ধে অংশ নেয় সংগ্রাম করে, সেই স্বাধীন দেশে তাকে মরতে হচ্ছে। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তাকে যেমন কেউ দেখতে আসে নি, তেমনি  তাকে দেয় নি কেউ দেশ স্বাধীন হবার সংবাদ। তাই গফুরকে আক্ষেপ ভরা সুরে বলে-

কই, কেউ তো আমারে কলো না যে দ্যাশ স্বাধীন হইছে। কেউ তো কলো না এখন কি হবে?  আসফ আলির  সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিতে লাগল। (২৫)

অন্যত্র বলে-

হাসপাতালে  মরিছি এই কথা আমার মারে কবা, ঠিক তো?  আর বলবা তার কবর হইছে কিনা জানি না। হাসপাতালে তারে কেউ দেখতে আসে নি। মরে গেলে টান মারে ফালায়ে দিছে কি না সেকথা তুমি কতে পারো না- এই কথা মারে বলবান।(২৬)

যুদ্ধ শেষ এখন তার  বাড়ি যাবার কথা। মা তার জন্য ‘সোন্দর বউ’ দেখে রেখেছে-বিয়ে করবে, কিন্তু তাকে প্রাণ হারাতে হয় হাসপালে। সে গফুরকে বলেছে তার মৃত্যুর সংবাদ মাকে পৌঁছে দিতে। স্বাধীন দেশের বাতাস মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ভাঙার আর্তনাদে এমনি করেই ভারি হয়ে উঠেছিল- যার এক বাস্তব রূপ লেখক দান করেন এ গল্পে।

‘কেউ আসে নি’গল্পের মতোই ‘ফেরা’ গল্পে উঠে এসেছে স্বাধীন দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশা-নৈরাশ্যের কথা। যুদ্ধকালীন আলেফের স্বপ্ন ছিল, সে হয়তো দেশ স্বাধীন হলে দুমুঠো ভাত খেতে পারবে। আবার  ললিতনগরের  বিলে  চিংড়ি  ধরবে,  কিন্তু তা স্বপ্নই থেকে যায়। এই স্বাধীন দেশে তার মতো হাজারো মুক্তিযোদ্ধাকে সে দেখতে পায় রাইফেল কাঁধে করে হাঁটছে বেকার কর্মহীন অবস্থায়। আলেফের মায়ের স্বপ্ন সে আবার ভিটের চেহারা ফিরাবে। তাই আলেফকে সামান্য জমি কিনতে বলে, আর কিনতে বলে গাভী এবং দুটি বলদ। তার বউ স্বপ্ন দেখে স্বাধীন দেশে তাদের আর দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। রাজা-বাদশাদের মতো না হোক, সাধারণ লোকদের মতো ভাত-কাপড় পড়ে বেঁচে থাকতে পাবে।                                 

তাদের এমন স্বপ্ন-আশা সবই বেলোয়ারি চুড়ির মতো ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নি। আলেফ এতদিন যুদ্ধ করেছে দেশকে স্বাধীন করার জন্য, আর এখন যুদ্ধ করবে নিজের পেটকে বাঁচানোর জন্য। সে রাইফেল সরকারকে জমা না দিয়ে ফেলে দেয় পাশের ডোবায়।  

 স্বাধীন দেশকে ঘিরে সাধারণ জনগণের যে স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্ন ভাঙার বা হতাশার স্পষ্টতাই হয়ে উঠেছে ‘ঘরগেরস্থি’ গল্পের মূল আলোচ্য। যুদ্ধের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য রামশরণ ভারতে যায়। দেশ স্বাধীন হলে তারা দেশে ফিরে আসে। স্বাধীন দেশকে ঘিরে ভানুমতি স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে, যে স্বপ্নের জালে ধরা পড়ে ছেলে-ছেলের বউ-ঝকঝকে ঘর- হালের বলদ-জমি-মাছ ভরা পুকুর আর গোলা ভরা ধানের ছবি।

উত্তর আর পুব পশ্চিম পোঁতার তিনটে ঘর পরিষ্কার ঝকঝকে উঠোন ঘিরে। ছেলে বউ নিয়ে আছে একটায়, একটায় তারা নিজেরা আছে, উত্তরেরটা ফাঁকা, জামাই মেয়ে নিয়ে এলে ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশের  বউ  ভানুমতি ততদিন ধরে সংসার করছে-কি বিচিত্র অভিজ্ঞতা তার! সে কি জানে না কেমন হতে হয় সুখের সংসার? গোয়াল, গাই-গররু, হাল -বলদ, জমি-জমা, পুকুরভর্তি মাছ আর গোলা ভরা ধান দূরস্থিত স্বপ্নের মতো ভানুমতিকে প্রচ- আকর্ষণে টানে।(২৭)

কিন্তু এমন স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হতে বেশি দেরি লাগে নি। রামশরণ পরিবার জীবন বাঁচানোর জন্য ভারতে যায়, দেশ স্বাধীন  হলে সেখানের শেয়াল কুকুরের মতো জীবন-যাপন  পিছনে ফেলে দেশে  আসে। কিন্তু এদেশেও এসে শেয়াল কুকুরের মতো জীবন যাপন করতে হয়। ছেলেমেয়েরা দীর্ঘ অনাহারে থেকে মারা যায়। তাই রামশরণের আক্ষেপ-

স্বাধীন হইছি আমরা- ঘৃণায় আর রাগে রামশরণের গলার আওয়াজ চিড় খেয়ে গেল, স্বাধীন হইছি তাতে আমার বাপের কি? আমি তো এই দেহি, গত বছর পরাণের ভয়ে পালালাম ইন্ডেয়-নটা মাস শ্যাল কুকুরের মতো কাটিয়ে ফিরে আলাম স্বাধীন দ্যাশে। আবার সেই শ্যাল কুকুরের ব্যাপার। ছোওয়াল মিয়ের হাত ধরে আজ ইস্টিশান, কাল জাহাজঘাট-রামশরণের কথা ছড়াৎ ছড়াৎ শব্দে ধার ছিটকোতে থাকে, স্বাধীনটা কি, অ্যাঁ? আমি খাতি পালামনা-ছোওয়াল  মিয়ে শুকিয়ে মরে, স্বাধীনটা কোঁয়ানে? রিলিফের  লাইনে দাঁড়াও ফহিরের মতো-ভিক্ষে করো লোকের বাড়ি বাড়ি।(২৮)

 স্বাধীন দেশে পেট চালানো, পোকামাকড়ের মতো জীবনকে টেনে নেওয়ার জন্য, রামশরণকে চাল-কাপড়ের প্রত্যাশায় যেমন রিলিফের লাইনে দাঁড়াতে হয়, তেমনি ভিক্ষা করতে হয় লোকের বাড়ি বাড়ি-ইস্টিশনে।

স্বাধীন দেশের সাধারণ জনগণের পাওয়া না পাওয়ার হাহাকার ধরা পড়ে রামশরণ ও ভানুমতির সংলাপের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপতায়-

রামশরণ বলে, ভাবনা কি তোর? সরকার জমি দেচ্ছে, গাড়ি গাড়ি চাল দেচ্ছে, বাঁশ বেড়া টিন দিয়ে ভিটেয় বাড়ি তুলে দেচ্ছে, তারপর আকাশ থেকে পড়বেনে একজোড়া জোয়ান বলদ।

ভানুমতি ককিয়ে কাঁদে, অ মা অরুন্ধতী, কোথা গেলিরে তুই? দু তিনবার চিৎকার করে আবার গলা নামায় ভানুমতি,সাপের মন্ত্রপড়ার মতো একঘেয়ে ঝিম-মারা সুরে গুনগুন করতে থাকে। শুনতে শুনতে অসহ্য হয়ে ওঠে রামশরণের। সে বলে, অ ভানুমতি, আমি বলতিছি কি-স্বাধীন হইছি না কি হইছি আমি বোঝবো কেমন করে? আগে এট্টা ভিটে ছিলো, এখন তাও নেই। আমার স্বাধীনটা কিসি?

                   কান্না থামিয়ে ভানুমতি খুব উদাস ম্রিয়মাণ গলায় বলে, ক্যানো সরকার থে পাবে না কিছু?

                   এই যে পাইছি সাত সের চাল আর ইন্ডে থেকে দিইছে কটা কম্বল। এই পাইছি।

                   ঘর দোর বানাতে কিছু দেবে না আমাদের?

                   তোর কি মনে হয়? রামশরণ পাল্টা জিগগেস করে। এখেনে তোরে কি দেবেনে ক।

                   তবে যে কয় গেরামে গেরামে ঘর বানিয়ে দেবে।

আচ্ছা আচ্ছা দেচ্ছে, রামশরণ বলে, তিনদিনের চাল আছে তোর । চালটা ফুরিয়ে গেলে কি করবি?, চাল ফুরোলি ভিক্ষে করবি কনে? কেউ আছে ইদিকে ? তিনদিন পর চাল নে আসছে কি সরকারের লোক? বাঁশ বেড়া আনতিছে? ভাবসাব যা দ্যাখলাম সরকারের লোক যদি আসেও, ততদিনে তোর আমার হাড়ে ঘাস গজিয়ে যাবেনে ।(২৯)

স্বাধীনতা রামশরণের কাছে কোন অর্থ বয়ে আনে না। আগে তার একটা ভিটে ছিলো , এখন তাও নেই। সে কয়েক সের চাল আর কয়েকটা  কম্বল পেয়েছে, সে চাল ফুরলে  কী  করবে  তা  অনিশ্চিত। একদিন হয়তো  তারা  রিলিফের  চাল- বাঁশ  পাবে  ততদিনে  তাদের  হাড়ে  ঘাস গজাবে।

 মূলত এই গল্পগুলোর পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে  শরীর শিউরে ওঠার মতো মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বিবরণ, আসফ-ভানুমতি-আলেফের মতো হাজারো মানুষের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব-নিকেশ, অপূর্ণতার হাহাকার। 

একটা ধারণা অমাদের কাছে স্পষ্ট,  ইতিহাবিদ ঘটনার খাতিরে ঘটনাকে বিশ্লেষণ করেন, সেখানে থাকে না কোন আবেগ-অনুভূতির জায়গা। কিন্তু হাসান আজিজুল হক  ইতিহাস নিয়েছেন, সেই ইতিহাসকে জীবন্ত করে  তুলেছেন- চরিত্রের আবেগ-অনুভূতি যোগের মধ্য দিয়ে। ইতিহাস নড়েচড়ে উঠেছে-চরিত্রের নড়েচড়ে ওঠার অবকাশে। তাই লেখক মুক্তিযুদ্ধের  সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোকে বাস্তব ও বেশ জোরালোভাবে তুলে আনতে সক্ষম হন গল্পে। আসলে  মুক্তিযুদ্ধ  সম্পর্কে লেখকের যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তারই প্রতিফলন যেন ঘটেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ক গল্পগুলোতে।  যুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া নানা লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ, যুদ্ধ-পরবর্তীকালে মানুষের প্রত্যাশা ছিল দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে শান্তিতে ঘুমাবে, কিন্তু তা পূরণ  না হওয়ায় তাদের মাঝে যে হতাশা দানা বেঁধে ওঠে, তা দক্ষ কারিগরের মতো হাসান আজিজুল হক তুলে এনেছেন গল্পে।  এ গল্পগুলো যেন মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী হতোদ্যোমের এক অনন্য দলিল হয়ে রয়েছে।

তথ্যসূত্র

১. সরিফা সালোয়া ডিনা,  হাসান  আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের বিষয় ও প্রকরণ, বাংলা একাডেমি,  ঢাকা, ২০১০, পৃ. ১৫৫

২. হাসান  আজিজুল হক, ‘ভূষণের একদিন’,  গল্পসমগ্র ১, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা,  ২০১১, পৃ. ২৪৮

৩. সরিফা সালোয়া ডিনা, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫৭

৪. হাসান  আজিজুল হক,  ‘ভূষণের একদিন,’  পূর্বোক্ত, পৃ. ২৪৫

৫. রাবেয়া খাতুনের সাক্ষাৎকার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র:অষ্টম খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তথ্য মন্ত্রণালয়, ২০০৯, পৃ.৪২

৬. মোহাম্মদ হোসেনের সাক্ষাৎকার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: অষ্টম খণ্ড,পৃ. ২৮

৭. হাসান  আজিজুল হক, ‘নামহীন গোত্রহীন’,  পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫৭

৮. ড. স্বপ্না রায়, ‘গল্পে একাত্তর ও তারপর’, শিলালিপি (কালের কণ্ঠ), ঢাকা, জানুয়ারি ২০১১, পৃ. ১৩

৯. চুন্নু ডোমের সাক্ষাৎকার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: অষ্টম খণ্ড, পৃ. ৩৭

১০. হাসান  আজিজুল হক, ‘কৃষ্ণপক্ষের দিন’,  পৃ. ২৬৮

১১. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৪

১২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৪

১৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭২

১৪. প্রাগুক্ত,  পৃ. ২৭১

১৫. হাসান  আজিজুল হক,  ‘আটক’  পৃ. ২৭৮

১৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৯

১৭. হাসান  আজিজুল হক, ‘মাটির তলায় মাটি’গল্পসমগ্র ২, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১১

১৮. হাসান  আজিজুল হক, একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৬৬

১৯. হাসান  আজিজুল হক, ‘ঝড়’  গল্পসমগ্র ২, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা,  ২০১১, পৃ. ২৪৫

২০. রাবেয়া খাতুনের সাক্ষাৎকার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: অষ্টম খণ্ড, পৃ. ৪২

২১. হাসান  আজিজুল হক, ‘নবজাতক,’ পৃ. ২৪৭

২২. প্রাগুক্ত, পৃ. ঐ

২৩. সরিফা  সালোয়া ডিনা, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৮৪

২৪. হাসান  আজিজুল হক, ‘কেউ  আসে নি’,  গল্পসমগ্র ১, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৮৭

২৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৯

২৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৮

২৭. হাসান  আজিজুল হক, ‘ঘরগেরস্থি’, পৃ. ৩০৫

২৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৮

২৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৯  

(হারুন  পাশা, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here