২৫শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার, বিকাল ৩:১৩
চর্যাপদ : বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন
বুধবার, ২৫ মে ২০২২

গোলাম মুস্তাফা।।

বাংলা ভাষার প্রাচীনতম সাহিত্যনিদর্শন চর্যাপদ আবিষ্কৃত হয়েছিল আজ থেকে শতবর্ষ পূর্বে; ঊনিশশত সাত সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে বাংলা সাহিত্যের এই অমূল্য সম্পদ আবিষ্কার করে আমাদের ভাষা সাহিত্যের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর  এই আবিষ্কার আমাদের গৌরবান্বিত করেছে এই গৌরবের সুযোগ অধিকার করে দেওয়ার জন্য চর্যাপদ আবিষ্কারের এই শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে আমি সকল বাংলাভাষীর পক্ষ থেকে আজ মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে সকৃতজ্ঞ অভিনন্দন জানাই  চর্যাপদ আবিষ্কারের পূর্বে বাংলা সাহিত্যের সম্পদ সম্পর্কে সাধারণ্যে কী ধরনের মনোভাব ধারণা ছিল সে সম্পর্কে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উল্লেখ করেছেন

যখন প্রথম চারিদিকে বাঙ্গালা স্কুল বসান হইতেছিল এবং লোকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বর্ণপরিচয়, বোধোদয়, চরিতাবলী, কথামালা পড়িয়া  বাঙ্গালা  শিখিতেছিল, তখন তাহারা মনে করিয়াছিল, বিদ্যাসাগরই বাঙ্গালা ভাষার জন্মদাতা কারণ, তাহারা ইংরাজীর অনুবাদ মাত্র পড়িত, বাঙ্গালা ভাষার যে আবার একটা সাহিত্য আছে এবং তাহার যে আবার একটা ইতিহাস আছে, ইহা কাহারও ধারণাই ছিল না তারপর শুনা গেল, বিদ্যাসাগরের আবির্ভাবের পূর্ব্বে রামহোমন রায় গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য্য বাঙ্গালার অনেক বিচার করিয়া গিয়াছেন এবং সেই বিচারের বহিও আছে ক্রমে রামগতি ন্যায়রতœ মহাশয়ের বাঙ্গালা ভাষার ইতিহাস ছাপা হইল তাহাতে কাশীদাস, কৃত্তিবাস, কবিকঙ্কণ প্রভৃতি কয়েকজন বাঙ্গালা ভাষার প্রাচীন কবির বিবরণ লিখিত হইল বোধ হইল, বাঙ্গালা ভাষায় তিনশত বৎসর পূর্ব্বে খানকতক কাব্য লেখা হইয়াছিল; কিন্তু তাহাও এমন কিছু নয়, প্রায়ই সংস্কৃতের অনুবাদ রামগতি ন্যায়রতœ মহাশয়ের দেখাদেখি আরও দুই চারিখানি  বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস বাহির হইল, কিন্তু সেগুলি সব ন্যায়রতœ মহাশয়ের ছাঁচেই ঢালা এই সকল ইতিহাস সত্ত্বেও খৃষ্টাব্দের ৮০ কোটায় লোকের ধারণা ছিল যে, বাঙ্গালাটা একটা নূতন ভাষা, উহাতে সকল ভাব প্রকাশ করা যায় না, অনুবাদ ভিন্ন উহাতে আর কিছু চলে না, চিন্তা করিয়া নূতন বিষয় লিখা যায় না, লিখিতে গেলে কথা গড়িতে হয়, নূতন কথা গড়িতে গেলে হয় ইংরাজী, না হয় সংস্কৃত ছাঁচে ঢালিতে হয়, বড় কটমট হয়।(১)

বাংলা ভাষা সাহিত্যের দীনতা সম্পর্কে এই মনোভাব হরপ্রসাদ শাস্ত্রীরও ছিল কিন্তু ১৮৮৬ সালে বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান নিযুক্ত হওয়ার পর সেই গ্রন্থাগারের সংগ্রহ দেখে তাঁর মত অনেকটাই বদলে গেল বেঙ্গল লাইব্রেরিতে বৈষ্ণবদের গান সংকীর্তনের এক বিরাট সংগ্রহ তিনি পেলেন, সেই সঙ্গে  জীবনচরিত ইতিহাস সম্পর্কিত অনেক বইয়ের সংগ্রহ দেখে তিনি বিস্মিত হলেন সেই সময় মুদ্রিত পুথির বিশাল সংগ্রহ দেখে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী হাতে লেখা পুথির ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তাঁর ভাষায় : বাঙ্গালা পুথি সংগ্রহের একটা উৎকট আগ্রহ জন্মিল  এই সময় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ধর্মঠাকুর সম্পর্কে বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন তাঁর মনে হয়েছিল, ধর্মমঙ্গলের ধর্মঠাকুরই বৌদ্ধ ধর্মের শেষ দেবতা এই ধারণার সমর্থনে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য তিনি ‘ধর্মমঙ্গলে’র পুথি পাওয়ার ব্যাপারে জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন

পেয়ের গেলেন মাণিক গাঙ্গুলীর ‘ধর্মমঙ্গল এই সময় রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ তাঁর হস্তগত হয় ধর্মঠাকুর সম্পর্কিত বেশ কিছু পুথি সংগ্রহে আসার পর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী হিন্দুরাজার অধীনে নেপালে বৌদ্ধধর্মের অবস্থা জানার জন্য নেপাল যাবার মনস্থ করেন

এর বেশ কিছুকাল আগে থেকেই ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদগণ বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন উনিশ শতকের প্রথমদিকেই নেপাল তিব্বতে সংরক্ষিত বৌদ্ধধর্ম বিষয়ক প্রাচীন পুথির সন্ধান করতে থাকেন ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদগণ ইংরেজ গবেষক ব্রায়ান হজসন (Brian Hodgson) নেপাল থেকে সর্বপ্রথম তান্ত্রিকবৌদ্ধধর্ম বিষয়ক অনেকগুলো পুথি আবিষ্কার করেন হজসন তাঁর আবি®কৃত পুথিগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেছিলেন The Asiatic Researches পত্রিকায়, ১৮২৮ সালে হজসনের এই আবিষ্কারের ফলে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দেয় ফরাসী পণ্ডিত  ইউজিন বুর্নফ (Eugene Burnouf) বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস নিয়ে রচনা করেন (Introduction a l’histoire du Buddhisme Indien)  গ্রন্থটি এটি প্রকাশিত হয় ১৮৪৪ সালে, প্যারিস থেকে আরেকজন ইংরেজ গবেষক ড্যানিয়েল রাইট (Daniel Wright) কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পুথি অনুসন্ধান করতে গিয়েছিলেন নেপালে তিনিও বৌদ্ধধর্ম বিষয়ক বেশ কিছু পুথি আবিষ্কার করেছিলেন  

এই পটভূমিতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রথমবারের মত নেপাল গেলেন ১৮৮৭ সালে, পরের বছর দ্বিতীয়বারের জন্য নেপাল যান তিনি এই দুইবারের নেপাল যাত্রায় তিনি সংস্কৃত ভাষায় লেখা বেশ কয়েকটি পুথি পেয়েছিলেন এরই মধ্যে তিনি ডাকার্ণব নামে একটি পুথি পেলেন ডাকার্ণব টির ভাষা তাঁর কাছে অপরিচিত মনে হয়েছিল, কোন্  ভাষায় সেটি রচিত, তা বুঝতে  পারেন নি তবু সেই পুথি তিনি নকল করে নিয়ে এলেন সুভাষিত সংগ্রহ নামে একটি পুথিও তিনি তখন দেখেছিলেন সুভাষিত সংগ্রহের ভাষাটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কাছে বেশ নতুন মনে হয়েছিল সেই পুথি ইংরেজ পণ্ডিত সেসিল বেন্ডল (Cecil Bendall) নকল করে নিয়েছিলেন এই সময় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী একটি দোহাকোষপঞ্জিকা পেয়ে সেটি নকল করে নেন পরে দোহাকোষপঞ্জিকা তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়; এজন্য তিনি সেসিল বেন্ডলকে অভিযুক্ত করেছিলেন বেন্ডল সুভাষিত সংগ্রহ সম্পাদনা করে ১৯০৫ সালে প্রকাশ করেন তিনি এর ভাষাকে Òdifficult Apabhramsa Prakrit” নামে অভিহিত করেছেন নতুন একটি ভাষার পুথি দেখে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী হয়ত আরও উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন, এই উৎসাহ নিয়েই তিনি তৃতীয়বারের মত নেপাল গেলেন ১৯০৭ সালে এইবার নেপাল গিয়েই তিনি পেয়ে গেলেন সেই স্বর্ণভাণ্ডার Ñ  বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের পুথি চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় এই আবিষ্কার সম্পর্কে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী জানাচ্ছেন : ১৯০৭ সালে আবার নেপালে গিয়া আমি কয়েকখানি পুথি দেখিতে পাইলাম একখানিক নাম ‘চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়, উহাতে কতকগুলি কীর্ত্তনের গান আছে তাহার  সংস্কৃত টীকা আছে গানগুলি বৈষ্ণবদের কীর্ত্তনের মত, গানের নাম ‘‘চর্য্যাপদ আর একখানা পুস্তক পাইলামÑ তাহাও দোঁহাকোষ, গ্রন্থকারের নাম সরোরুহবজ্র, টীকাটি সংস্কৃতে, টীকাকারের নাম অদ্বয়বজ্র আরও একখানি পুস্তক পাইলাম, তাহার নামও দোঁহাকোষ, গ্রন্থকারের নাম কৃষ্ণাচার্য্য, উহারও একটি সংস্কৃত টীকা আছে।(৩)

১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়, কৃষ্ণাচার্য সরোহরুহবজ্রের দুটি দোহাকোষ  এবং এর আগে পাওয়া ডাকার্ণব Ñ এই চারটি পুথি সম্পাদনা করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে সেগুলো প্রকাশ করেন ১৯১৬ সালে চারটি পুথির এই সংকলনের নাম দেন হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান দোহা 

এই নামকরণের মধ্যে পুথিগুলোর রচনাকাল, ভাষা, বিষয়বস্তু রূপগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে শাস্ত্রী তাঁর সিদ্ধান্তও ব্যক্ত করেন শাস্ত্রীর সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে দুটি বিষয়ে কোন মতপার্থক্য দেখা দেয়নি Ñ এগুলো বৌদ্ধধর্ম বিষয়ক এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন আপত্তি ওঠে নি; এগুলো সংগীত রূপে রচিতÑ এই সিদ্ধান্ত নিয়েও দ্বিমত করার কোন সুযোগ ছিল না শাস্ত্রীর বইতে চারটি পুথি সংকলিত হলেও বাংলাভাষী পণ্ডিতদের আগ্রহ দেখা দেয় প্রধানত চর্যাপদ নিয়েই বাকি তিনটি পুথিকে বঙ্গীয় পণ্ডিতগণ বাংলা ভাষায় রচিত বলে মনে করেন নি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান দোহায় সংকলিত পুথিগুলোর মধ্যে দুটি ভাষার অস্তিত্ব লক্ষ্য করেছেন : Two different dialects are found in these three works. The dialect of `Caryas’ alone is Bengali, as its peculiar forms show (e.g., the genetive in এর, অর <era, ara >, dative in রে  <re> … The two `Doha-kosas’ present the same dialect, which is a kind of Western (Sauraseni) Apabhransa. (৪)

সুনীতিকুমার দোহাকোষগুলোর ভাষাকে অপভ্রংশরূপে সনাক্ত করেছেন পশ্চিমী বা শৌরসেনী অপভ্রংশ সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে পূর্ব ভারতে এক সময় বেশ সমাদৃত ছিল নবম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত এই ভাষা ভারতবর্ষের পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগের ভাষা (Lingua Franca) রূপে প্রচলিত ছিল কাজেই সেই সময়ে এই অঞ্চলে এই ভাষায় কোন সাহিত্য রচিত হওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল না ডাকার্ণবের ভাষাকে সুনীতিকুমার তৃতীয় একটি প্রাকৃত ভাষা বলে অভিহিত করেছেন তাঁর মতে ডাকার্ণবের ভাষার ভিত্তি পশ্চিমী অপভ্রংশ হলেও বাংলার সঙ্গে এর নৈকট্য নেই।(৫) বিজয়চন্দ্র মজুমদারও ডাকার্ণবের ভাষাকে বাংলা বলে স্বীকার করেন নি।(৬)

চর্যাপদকে  বাংলা বলে অনেকেই স্বীকার করে নিলেন; কিন্তু  এই নিয়ে অনেক প্রশ্নও উত্থাপিত হল সংশয় প্রশ্ন দেখা দিল রচনাকাল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে শাস্ত্রীয় আরও কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে চর্যাপদের যে পুথিটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পেয়েছিলেন তিনি তার নাম দিয়েছেন চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চিয় কিন্তু এই নামকরণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে আপত্তি দেখা দেয় পণ্ডিত বিধুশেখর ভট্টাচার্য Indian Historical Quarterlyতে প্রকাশিত একটি ছোট প্রবন্ধে শাস্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন : One of the four books edited by Haraprasad Sastri in his Bauddha Gan o Doha (Vangiya Sahitya Parisat, 1328 B.S.) is called Caryacaryaviniscaya, There is, however nothing in his introduction to show as to how he has ascertained the title of the work. Where has he got it? He may have found it somewhere in the MS. from which he has prepared the edition. But is there any justification for its being so called?(৭)

বিধুশেখর ভট্টাচার্যের মতে চর্যাপুথির বিষয়বস্তুর বিচারেও শাস্ত্রী প্রদত্ত নাম গ্রহণীয় নয় : Literally the title, Caryacaryaviniscaya, means `the decision about what is to be  practised and what is not to be practised. But does the work deal with it? Certainly not. Therefore so far as the contents are concerned, the above mentioned title can in no way be justified. (৮)

এই সংকলনের প্রথম চর্যার টীকায় লিখিত শ্লোকের প্রথম চরণ ‘শ্রীলূয়ীচরণাদিসিদ্ধরচিতেপ্যাশ্চর্য্যচর্য্যাচয়অনুসরণে বিধুশেখর এই পুথির নাম ‘আশ্চর্য্যচর্য্যাচয় হওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পাঠ অনুযায়ী এই চরণ : ‘শ্রীলূয়ীচরণাদিসিদ্ধরচিতেপ্যাশ্চর্য্যচর্য্যাচয় এই চরণে একটি লুপ্ত ‘হ ব্যবহার করে শাস্ত্রী যে পাঠভ্রান্তির শিকার হয়েছেন তার কারণেই পুথির নামকরণে শাস্ত্রী এই ভুল করেছেন বলে বিধুশেখর মনে করেন        

বিধুশেখর ভট্টাচার্যের এই মতের অনুগামী হয়েছেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শহীদুল্লাহ্ তাঁর চর্যাপদের সংকলন Buddhist Mystic Songsএর বাংলা নাম দিয়েছেন ‘আশ্চর্যচর্যাচয় প্রবোধচন্দ্র বাগচী শান্তি  ভিক্ষু শাস্ত্রী যৌথভাবে চর্যাপদের যে সংকলন প্রকাশ করেছেন তার ভূমিকায় শান্তি ভিক্ষু শাস্ত্রী বিধুশেখর ভট্টাচার্যের সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন নি তিনি মনে করেন, নেপালে প্রাপ্ত পুথিতেই শাস্ত্রী প্রদত্ত নামটি আছে তাঁর মতে: I see no justification to invent a new name when the old one conveys the better meaning, that is viniscaya`determination’ of carya ‘that is to be practised, and acarya` that not to be practised’. (৯) 

পুথির তিব্বতী অনুবাদে এর সংস্কৃত নাম দেওয়া হয়েছে ‘চর্য্যাগীতিকোষবৃত্তিনাম এই ইঙ্গিত অনুসরণে প্রবোধচন্দ্র বাগচী শান্তি ভিক্ষু শাস্ত্রী সম্পাদিত চর্যাপদ সংকলনের নাম দেওয়া হয়েছে : CARYAGITI-KOSA OF BUDDHIST SIDDHAS, তবে, প্রবোধচন্দ্র বাগচী গ্রন্থনাম চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয় হওয়াই সংগত বিবেচনা করেছিলেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রদত্ত নামটিও তাঁর স্বকপোলকল্পিত বলে মনে করেন নি এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য : আমার মনে হয়েছিল যে, মূলে এই নামটি ছিল ‘চর্য্যাশ্চচর্য্যবিনিশ্চয়’Ñ লিপিকর প্রমাদে ওই নামটি চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় রূপ নিয়েছে এই সংশোধনে সংস্কৃত টীকায় উল্লিখিত নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করা চলে ছন্দের খাতিরে ‘চর্য্যাচর্য্য টীকার শ্লোকে আশ্চর্য্যচর্য্যা হয়েছে  তাছাড়া টীকার ওই শ্লোকে মূল নামটি যে পুরোপুরি উল্লেখ করা হয়েছে তা মনে করবারও বিশেষ কারণ নেই বিশেষত মঙ্গলাচরণের শ্লোকে তা করাই হয় না এই কারণে বলেছিলাম যে গ্রন্থের চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয় নাম করাই বিধেয়।(১০)   

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাগানগুলোকে সন্ধ্যা ভাষায় রচিত বলে উল্লেখ করেছেন : সন্ধ্য ভাষা মানে, আলো আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না অর্থাৎ এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্ম্মকথার ভিতর একটা অন্য ভাবের কথাও আছে।(১১)

সন্ধ্যাভাষা কথাটি মুনি দত্তকৃত চর্যাপদের টীকায় আছে :

তমেব মহাসুখরাজং স্বানন্দসবপানপ্রমোদমনসা কুক্কুরীপাদাঃ সন্ধ্যাভাষয়রা প্রকটয়িতুমাহঃ।(১২)

শাস্ত্রী হয়ত এই টীকা থেকেই ‘সন্ধ্যাভাষা কথাটি ব্যবহার করেছেন তবে এই পরিভাষা সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দেয় এই ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করে পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন : আমরা শাস্ত্রী  মহাশয়ের এই বিবৃতি ষোল আনা গ্রহণ করিতে পারিলাম না ভাগলপুর জেলার দক্ষিণপূর্ব্বাংশ, সাঁওতাল পরগণা এবং বীরভূমের পশ্চিমাংশ, এই ভূভাগকে সন্ধ্যা দেশ কহে, অর্থাৎ ইহা আর্য্যাবর্ত্ত এবং বঙ্গদেশের সন্ধিস্থলে অবস্থিত; এই প্রদেশের ভাষাকেও সন্ধ্যাভাষা কহে শাস্ত্রী মহাশয় যদি ভাগলপুরের ছেকাছেকি নামক প্রচলিত ভাষা জানিতেন, পারে রাজমোহন পারে কাড়াকাণ্ড নগরের ভাষা জানিতেন, পঞ্চকোট হইতে হেতমপুর পর্য্যন্ত যে সকর নানা বিভাষা প্রচলিত, তাহার যদি পরিচয় তাঁহার থাকিত, তাহা  হইলে তিনি স্পষ্টতই বুঝিতেন যে, সিদ্ধাচার্য্যগণের অবলম্বিত দোহা পদসকলের ভাষা এই দেশেরই সন্ধ্যাভাষা বা বিভাষাশাস্ত্রী  মহাশয় শুনিলে বোধ হয় বিস্মিত হইবেন তাঁহার সংগৃহীত দোহাবলীর ভাষা এখনও অপ্রচলিত হয় নাই উচ্চারণ বানানের একটু পার্থক্য ঘটিয়াছে বটে, পরন্ত আসল ভাষা সেই পুরাতন সনাতন রহিয়া গিয়াছে (১৩)

সন্ধ্যাভাষাকে বিশেষ একটি অঞ্চলের ভাষা দাবি করার মধ্যে শাস্ত্রীর মূল কথাটি উপেক্ষিত হয়েছে শাস্ত্রী এই ভাষার মধ্যে একটি উচ্চতর ধর্মীয় দর্শন প্রকাশিত হওয়ার যে ইঙ্গিত করেছেন তা পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় বিবেচনা করেন নি বিধুশেখর ভট্টাচার্য পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারণাকে কল্পনাপ্রসূত বলে অগ্রাহ্য করেছেন তবে, পরিভাষা হিসেবে ‘সন্ধ্যাভাষা প্রয়োগ নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন তিনি তাঁর মতে সন্ধ্যাভাষার পরিবর্তে সন্ধাভাষা ব্যবহার করাটাই যুক্তিযুক্ত তিনি মনে করেন, সন্ধা শব্দটি সন্ধায় শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ এবং সমএর সঙ্গে ধা যুক্ত হয়ে এটি নিষ্পন্ন হয়েছে :  The sandha of sandha-sandha-bhasita, etc is a shortened form of sandhaya, a gerund from sam +√dha is beyond doubt.(১৪)

সংস্কৃত ভাষার অভিসন্ধায়, অভিপ্রেত্য, উদ্দিশ্য  শব্দগুলো যে অর্থে ব্যবহৃত হয় সেই অর্থেই এখানে সন্ধাভাষা গ্রহণ করা যেতে পারে বলে বিধুশেখর ভট্টাচার্য মনে করেন তিনি এর অর্থ হিসেবে অভিপ্রায়িকবচন বা ন্যায়ার্থবচন ব্যবহারের পক্ষপাতী

ইউজিন বুর্নফ সদ্ধর্মপুণ্ডরীকের ফরাসী অনুবাদ Le Lotus de la Bonne Loiতে সন্ধাভাষার অর্থ করেছেন Ñ প্রহেলিকাভাষা (le language enigmatique). এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদক mystic শব্দটি ব্যবহার করেছেন সন্ধাভাষা অর্থে  ম্যাক্স মুলার একে বলেছেন যরফফবহ hidden saying বা গুপ্তবাণী  প্রবোধচন্দ্র বাগচী সন্ধ্যাভাষা সন্ধাভাষা বিতর্কে বিধুশেখর ভট্টাচার্যের মত সমর্থন করেছেন হরপ্রসাদ  শাস্ত্রী তাঁর আবিষ্কৃত পুথি অবলম্বনে সন্ধ্যাভাষা শব্দটি প্রয়োগ করেছিলেন; প্রবোধ বাগচী মনে করেন, নেপালী পুথিগুলোর নকল যথাযথ নয় বিধুশেখর শাস্ত্রীও পুথির নকলের যথার্থতার ব্যাপারে সংশয় ব্যক্ত করেছেন কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে রক্ষিত পুথির একটি জায়গায় শব্দটি সন্ধায়রূপে লিখিত বলে তিনি জানিয়েছেন‘সন্ধ্যা শব্দ সম্পর্কে বিধুশেখর শাস্ত্রীর বক্তব্য সমর্থন করে প্রবোধ বাগচী বলেন : There can be no doubt that the proper reading of the expression is sandhabhasa, and not sandhyabhasa, though it occures in a large number of badly copied Nepalese manuscripts. (১৫)    

প্রবোধ বাগচী এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে, সদ্ধর্মপুণ্ডরীকের চীনা অনুবাদে সন্ধা শব্দের অর্থ গোপন বা গুপ্ত হিসেবে গৃহীত হয়েছে বিধুশেখর ভট্টাচার্য প্রবোধ বাগচী Ñ এঁরা উভয়ই মনে করেন, শব্দের আভিধানিক অর্থের অতিরিক্ত কিছু ব্যক্ত করে বলেই চর্যার ভাষাকে সন্ধাভাষারূপে অভিহিত করা যায় এই ব্যাপারে খানিকটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন শশিভূষণ দাশগুপ্ত তিনি মনে করেন, সন্ধা শব্দটি অভিপ্রায়িক অর্থেই প্রযোজ্য, তবে এই ভাষার দুর্বোধ্যতার কারণে পরবর্তীকালে এটি সন্ধ্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। (১৬)

এই সন্ধাভাষার প্রয়োগ চর্যার অর্থগ্রহণকে দুরূহ করে তুলেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই চর্যার পদকর্তাগণ ছিলেন গুহ্যসাধক নিজেদের সম্প্রদায়ের বাইরের কেউ তাঁদের সাধনার তত্ত্ব উপলব্ধি করুক এটা তাঁরা চাইতেন না পদকর্তাদের ভাষা কতটা প্রহেলিকাময় তার স্বীকৃতি পাওয়া যাবে  কাহ্ণপার একটি পদে :

জেতই বোলী তেতবি টাল

গুরু বোব সে সীসা কাল ॥(১৭)

এর অর্থ : যতটা বলা হয়, তার সবটাই ছল গুরু বোবা শিষ্য কালা বোবা গুরু বধির শিষ্যের মধ্যকার ভাব বিনিময়ের মতই দুর্বোধ্য সে ভাষা কাহ্ণপার একটি পদে বলা হয়েছে

আলিএঁ কালিঁএ বাট রুন্ধেলা

তা দেখি কাহ্ণ বিমণা ভইলা ॥(১৮)

এই পদটির আক্ষরিক অর্থ : স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণে পথ রুদ্ধ হয়ে গেল তা দেখে কাহ্ণ বিমনা হল কিন্তু এর গূঢ় অর্থ হবে ইড়া এবং পিঙ্গলা সাধকের নির্বাণ লাভের পথকে বাধাগ্রস্ত করে দেয়, এবং এটা উপলব্ধি করে সাধক কাহ্ণ বিমনা গয়ে পড়ে; অন্য অর্থে Ñ এই পরমসত্য জ্ঞাত হয়ে কাহ্ণ বিশুদ্ধমনা হয় কুক্কুরীপা যখন বলেন :

দুলি দুহি পীঢ়া ধরণ জাই

রুখের তেন্তলি কুম্হীরে খাই ॥(১৯)

তখন এর সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় কচ্ছপীকে দোহন করে তা পাত্রে ধারণ করা যায় না, গাছের তেতুল কুমীরে খেয়ে ফেলে কিন্তু এর সাধনতত্ত্বগত ব্যাখ্যা হল: অনভিজ্ঞজন মহাসুখকমল দোহন করে চিত্তকে নির্বাণমার্গে পরিচালনা করতে পারে না কুম্ভক সাধনা দ্বারাই চিত্তকে নিঃস্বভাব করা যায় তিন্তরী বা তেঁতুল এখানে চিত্ত অর্থ অনুসরণের এই দুরূহতার ফলে চর্যাপদ পরিক্রমার পথ শুধু দুর্গম নয়, অনেক ক্ষেত্রে অগম্য হয়ে ওঠে এই ধরনের রচনাকে চর্যা নামে অভিহিত করা হত, Ñ সংকলিত পদগুলোর মধ্যেই তার প্রমাণ আছে কুক্কুরীপার পদে আমরা পেয়েছি :

অইসনী চর্যা কুক্কুরী পাএ গাইল

কোড়ি মার্ঝে একু হিঅহি সমাইল

চর্যা শব্দের অর্থ নিয়েও পণ্ডিতগণ একমত নন চর্যা শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ গমনশীল।(২০) চর্যা বলতে যোগী বা সাধকের আচারআচরণও বোঝায় আধ্যাত্মিক মার্গে গমন করার জন্য গেয় গীতকে চর্যা নামে অভিহিত করা যেতে পারে বলে অনেকের অনুমান সংগীতপ্রবন্ধের এক ধরনের প্রকারভেদও চর্যা নামে অভিহিত বিধুশেখর শাস্ত্রী বলেছেন : The word carya primarily means a religious observance, and secondary a treatise dealing with it. ম্যাক্স মুলার চর্যা শব্দের অর্থ করেছেন অধ্যয়ন মানোসোল্লাসে চর্যার সংজ্ঞার্থ দেওয়া হয়েছে : অর্থশ্চাধিত্মিকঃ প্রাসঃ পাদদ্বিতয় শোভনঃ উত্তরার্ধে ভববেং চর্যা সা তু নিগদ্যতে এতে বোঝা যায়, পুনরাবৃত্তিযুক্ত এবং দুটি শোভন পাদ সমন্বিত আধ্যাত্মিক রচনাই চর্যা নামে অভিহিত চর্যার  শেষাংশও প্রথমাংশের অনুরূপ

চর্যার পুথি আবিষ্কারের পর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর পাঠোদ্ধার করেন এবং সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন পরবর্তীকালের অনেক পণ্ডিতই শাস্ত্রীর পাঠ গ্রহণ করেন নি পাঠ নির্ণয়ে শাস্ত্রী পুথিনির্ভর ছিলেন  তবে সবখানেই যে তিনি পুথি অনুসরণ করেছেন তা বলা যাবে না কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি নিজের বিবেচনা প্রয়োগ করেছেন যেমন কৃষ্ণাচার্যের একটি পদের পাঠ নির্ণয় করেছেন তিনি : মোহভাণ্ডার লুই সঅলা অহারী এখানে অহারী অকারের নীচে একটি কুণ্ডলী চিহ্ন আছে কুণ্ডলী চিহ্ন থাকলে কার কারেরূপান্তরিত হয়, কিন্তু পুথির অন্য কোথাও কুণ্ডলী না থাকায় তিনি আহারী পরিবর্তে  অহারী পাঠই নির্দেশ করেছেন শাস্ত্রীর পাঠের সংস্কার করেছিলেন তারাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে তারাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যকৃত পাঠ প্রকাশ করা হয়েছিল বেশ কিছুদিন শাস্ত্রীর মূল পাঠের পরিবর্তে তারাপ্রসন্নের পাঠই তাঁরা প্রকাশ করে গেছেন সম্প্রতি আবার শাস্ত্রীর পাঠ তারাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের পাঠ এক সঙ্গে  প্রকাশিত হয়েছে শাস্ত্রীর পাঠের সঙ্গে তারাপ্রসন্নের পাঠের পার্থক্য আছে অনেক ক্ষেত্রেই যেমন প্রথম চর্যার শেষের দুটি চরণের পাঠ ভেদ আমরা এখানে পর্যবেক্ষণ করতে পারি :

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পাঠ               তারাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের পাঠ

ভণই লুই আম্হে সাণে দিঠা              ভণই লুই আম্হে ঝাণে দিঠা

ধমণ চমণ বেণি পাণ্ডি বইণ॥(২১)    ধমণ চমণ বেণি পিণ্ডি বইঠা ॥(২২)

দ্বিতীয় চরণের শেষ শব্দটি শাস্ত্রীর পাঠে বইণ এখানে বইণ গ্রহণ করলে পদ ছন্দচ্যুত হয় চর্যাপাঠের বেশ সংস্কার করেছেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, সুকুমার সেন নীলরতন সেন উপরিউক্ত চরণদ্বয়ের শহীদুল্লাহপ্রদত্ত পাঠ

ভণই লুই আম্হে ঝাণে দীঠা

ধমণ চবণ বেণি পিণ্ডী বইঠা ॥(২৩)

শহীদুল্লাহ প্রথম চরণের দিঠার বানান দিয়েছেন দীঠা; দ্বিতীয় চরণেরপিণ্ডি তাঁর পাঠে পিণ্ডী এবং চমণ হয়েছে চবণ  প্রবোধ বাগচী চযাঁর পুথির যে তিব্বতী অনুবাদ আবিষ্কার করেছিলেন তার ভিত্তিতে তিনি পদগুলোর একটি পাঠ প্রস্তুত করেছিলেন তাঁর পাঠানুযায়ী চরণ দুটি :             

 ভণই লুই আম্হে ঝাণে দিঠা

ধমণ চবণ বেণি পাণ্ডি বইঠা ॥(২৪)

প্রবোধ বাগচী শাস্ত্রীর সাণে’, বইণ গ্রহণ না করলেও, পাণ্ডি পরিত্যাগ করেন নি প্রবোধচন্দ্র বাগচী পরবর্তীকালে শান্তি ভিক্ষু শাস্ত্রীর সংস্কার করা পাঠ অবলম্বনে, তাঁদের যৌথ নামে CARYAGITE-KOSA OF BUDDHIST SIDDHAS নামে সংকলনটি প্রকাশিত হয়দেবনাগরী অক্ষরে কোন কোন পদের পাঠের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করেছি, প্রবোধ বাগচীর পাঠের সঙ্গে প্রদত্ত পাঠের সঙ্গেCARYAGITI- KOSA OF BUDDHIST SIDDHAS প্রদত্ত পাঠের মিল নেই   

দুই সংখ্যক চর্যার প্রথম দুই চরণের পাঠ পর্যবেক্ষণ করলে এই পার্থক্য ধরা পড়ে :  

Caryagiti-kosa এর পাঠ   তিব্বতী অনুবাদের ভিত্তিতে প্রবোধ বাগচীর পাঠ

দুলি দুহি পিটা ধরণ জাঅ   দুলি দুহি পিটা ধরণ জাই রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ ॥(২৫) রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাই ॥(২৬)

সুকমার সেনের পাঠে দ্বিতীয় চরণে পাণ্ডি বা পিণ্ডি/পিণ্ডীর পরিবর্তে পাত্তি দেওয়া হয়েছে :

ভণই লুই আম্হে সাণে দিঠা

ধমণ চমণ বেণি পাত্তি বইঠা ॥(২৭)

নীলরতন সেন চর্যাপদের পুথির যে ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ প্রকাশ করেছেন তাতে এই দুটি চরণের যে পাঠ দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে তাঁর  নিজের নির্ণিত পাঠের পার্থক্য লক্ষ করা যায় :

ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণের পাঠ    নীলরতন সেনের পাঠ

ভণই লুই আক্ষে সাণে দিঠা     ভণই লুই আম্হে ঝাণে দিঠা

ধমণ চমণ বেণি পাণ্ডি বইণ॥(২৮) ধমণ চমণ বেণি পাণ্ডি বইঠা।(২৯)

পাঠ সংস্কারের প্রয়োজনে প্রবোধচন্দ্র বাগচী শহীদুল্লাহ চর্যার পুথির তিব্বতী অনুবাদের সাহায্য নিয়েছেন এবং মুনি দত্তের টীকাও পর্যালোচনা করেছেন আমরা লক্ষ করেছি পাঠ নির্ণয়ের ব্যাপারে শহীদুল্লাহ তাঁর ভাষাবোধ প্রয়োগ করেছেন পুথির পাঠ হুবহু গ্রহণ না করে তিনি ব্যাকরণসিদ্ধ পাঠের উপরই গুরুত্ব আরোপ করেছেন এছাড়া অর্থজ্ঞাপকতার বিষয়টিও তাঁর বিবেচনার মধ্যে ছিল নব্যভারতীয় আর্যভাষা স্তরে যুক্তব্যঞ্জনের বিলুপ্তি ঘটে এবং এই কারণে স্বরধ্বনির দীর্ঘত্ব হয়

এই বিবেচনা থেকে শহীদুল্লাহ্  তাঁর পাঠে পুচ্ছিঅ পরিবর্তে পূছিঅ, অচ্ছহু জায়গায় আছহুঁদিঠা স্থলে দীঠা ব্যবহার করেছেন চর্যার পুথিতে অনেক শব্দের মধ্যভারতীয় আর্যভাষা স্তরের রূপ আছে মধ্যভারতীয় আর্যভাষা স্তরে তালব্য মূর্ধণ্য এর প্রচলন না থাকায় তিনি  সেইসব ক্ষেত্রে দন্ত ব্যবহার করেছেন শাস্ত্রীর পাঠে যেখানে মুষা শহীদুল্লাহর পাঠে সেখানে  মুসা, পুথির বিশুদ্ধি তাঁর পাঠে হয়েছে- বিসুদ্ধি তবে সর্বক্ষেত্রেই যে তিনি তালব্য বর্জন করেছেন তা নয় এই রকম পাঠভেদ চর্যার প্রতিটি পদের প্রায় প্রতিটি চরণেই আছে অনেক চরণে একাধিক শব্দের পাঠভেদও আমরা পেয়েছি পাঠভেদের কারণে অনেকক্ষেত্রে অর্থনিরূপণেও পার্থক্য দেখা যায় চর্যাঅধ্যয়নের অনেকগুলো বিড়ম্বনার মধ্যে এটিও একটি

আমরা এরই মধ্যে চর্যাপদের তিব্বতী অনুবাদের কথা বলেছি এই তিব্বতী অনুবাদ আবিষ্কার করেছিলেন প্রবোধচন্দ্র বাগচী, ১৯২৯ সালে অবশ্য চর্যার তিব্বতী অনুবাদের কথা প্রথম জেনেছিলেন সুনীতিকুমার চট্টেপাধ্যায় India Office Libraryi  F.W.Thomasএর কাছ থেকে তেঙ্গুরে প্রাচীন বাংলা এবং অপভ্রংশ ভাষায় রচিত বেশ কয়েকটি রচনার তিব্বতী অনুবাদ আছে Ñ এই সম্ভাবনার কথা জানতে পেরে  তিনি সেগুলোর সন্ধান করেন Cordierএর প্রণীত তেঙ্গুরের তালিকা অনুসরণ করে  Jean Przyluski সহায়তায় তিনি চল্লিশটি  গান বা কবিতার তিব্বতী অনুবাদ নকল করে নেন পরে সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায় যে এর মধ্যে একটি কবিতার সঙ্গে শাস্ত্রীআবি®কৃত পুথির ২৯ সংখ্যক  চর্যার মিল আছে।(৩০) পরে প্রবোধ বাগচী নেপালের রাজকীয় পুথিশালা থেকে চর্যাপুথির তিব্বতী অনুবাদ আবিষ্কার করেন এই তিব্বতী অনুবাদ করেছিলেন কীর্তিচন্দ্র, নেপালের স্বয়ম্ভূতে এই সূত্রেই জানা গেল চর্যাপদের টীকাকার মুনি দত্তের নাম আরও জানা গেল, মূল পুথিতে একশত গান ছিল তা থেকে মুনি দত্ত পঞ্চাশটি গান বেছে নিয়েছিলেন একটি সটীক পুথি প্রণয়ণের জন্য প্রবোধচন্দ্র বাগচী ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Journal of the Department of Letters এই তিব্বতী অনুবাদ প্রকাশ করেন Materials for a Critical Edition of Old Bengali Caryapadas  নামে এই সঙ্গে তিনি চর্যাপদের একটি পাঠও প্রস্তুত করেছিলেন প্রবোধচন্দ্র বাগচীর এই আবিষ্কার পরবর্তীকালে চর্যাগবেষকদের বেশ সাহায্য করেছে  চর্যাঅধ্যয়নের ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার বেশ সহায়করূপে বিবেচিত হয়েছে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবি®কৃত পুথিতে আমরা সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ পেয়েছিলাম মূল পুথির তিনটি পূর্ণ পদ এবং একটি পদের অর্ধাংশ তাতে ছিল না এই পদগুলো পাওয়া গেল এই তিব্বতী অনুবাদের পুথিতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যার পাঠ নির্ণয়ের ব্যাপারে সর্বত্র অভ্রান্ত ছিলেন না পরবর্তীকালে মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ অনেকেই চর্যার সঠিক পাঠ ব্যাখ্যা নির্ণয় করেছেন এই তিব্বতী অনুবাদের সাহায্যে প্রবোধচন্দ্র বাগচী চর্যায় ব্যবহৃত সন্ধ্যাভাষার শব্দাবলিরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা অর্থ দিয়েছেন এটা এখন চর্যাপাঠ উপলব্ধির জন্য অপরিহার্য সহায়করূপে বিবেচিত হচ্ছে গবেষকদের কাছে তবে, এই তিব্বতী অনুবাদের উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল মনীন্দ্র মোহন বসু এই প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেছেন : চর্য্যাপদগুলির এবং তাহাদের সংস্কৃত টীকা তিব্বতী অনুবাদ হইয়াছিল টীকা লিখিত হইবার কতকাল পরে এইরূপ অনুবাদ করা হইয়াছিল তাহার সন্ধান পাওয়া যায় না, এবং যিনি অনুবাদ করিয়াছিলেন তাঁহার এই ধর্মতত্ত্বে প্রবেশাধিকার কিরূপ ছিল তাহাও জানা যাইতেছে না এই অবস্থায় মূল সংস্কৃত টীকাটি যে তাহার অনুবাদ অপেক্ষা অধিকতর নির্ভরযোগ্য তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায় প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃত টীকায় ব্যাখ্যাত অর্থের সহিত তিব্বতীয় অনুবাদ মিলাইয়া দেখিলে স্পষ্টই ধারণা জন্মে যে, অনুবাদক অনেক স্থলেই অর্থগ্রহণ করিতে পারেন নাই।(৩১) 

তবে, মনীন্দ্র মোহন বসুর এই সংশয় সত্ত্বেও আমাদের মনে হয়, চর্যার পাঠ নির্ণয়, ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ অনুধাবনে তিব্বতী অনুবাদ বেশ গুরুত্বপূর্ণ

চর্যাপদের পুথি ছাড়াও আরও কয়েকটি বৌদ্ধগানের তিব্বতী অনুবাদ তেঙ্গুরে পাওয়া গেছে।(৩২) এর মধ্যে সহজগীতি লুইপাদগীতি উল্লেখযোগ্য সহজগীতির রচয়িতা শান্তিদেব, লুইপাদগীতির রচয়িতার নাম পাওয়া না গেলেও গ্রন্থনাম থেকে রচয়িতাকে লুইপা নামে সনাক্ত করা যায় এই লুইপা চর্যারচয়িতা লুইপা কিনাÑ এই কৌতূহল জাগা অস্বাভাবিক নয়  চর্যাপদের  পুথি আবিষ্কারের পর থেকেই এর ভাষা নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক দেখা দেয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা বলে উল্লেখ করেছিলেন তাঁর এই দাবির পেছনে কোন ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তি ছিল না শাস্ত্রীর এই দাবির ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করেন বিজয়চন্দ্র মজুমদার বিজয়চন্দ্র মজুমদার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ইতিহাস বিষয়ে ১৯২০ সালে বেশ কয়েকটি বক্তৃতা প্রদান করেন এই বক্তৃতামালার ত্রয়োদশ পর্বে তিনি চর্যাপদের ভাষা নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ মন্তব্য ব্যক্ত করেন পদগুলোর ছন্দরীতি ব্যাকরণবৈশিষ্ট্যের বিচারে এগুলোর কয়েকটিকে হিন্দি ভাষায় রচিত তিনি বলে রায় দিলেও পদগুলোর মধ্যে বিভিন্ন সময়ের, বিভিন্ন  ভাষার শব্দ ব্যাকরণবৈশিষ্ট্যের উপস্থিতির কারণে এগুলোকে বিশেষ কোন একটি ভাষায় রচিত বলে মানতে রাজি নন : Looking to the metrical system and the grammatical forms, some verses may be declared to be composed in Hindi. Generally the language of many effusions is such a jumble of various words and grammatical forms of various provinces and of various times, that we can hardly say that the writings represent any particular dialect. (৩৩)  

বিজয়চন্দ্র মজুমদার চর্যাপদের কয়েকটি শব্দ নিয়ে আলোচনা করেছেন তাঁর মতে চর্যাপদে প্রাচীন বাংলা শব্দের সঙ্গে কিছু মৈথিলি ওড়িয়া শব্দও আছেবি (অপিজাত) পইঠো অইসে, কইসে, কইসন্, জইসা, তইসে Ñ শব্দুগলোকে তিনি হিন্দিরূপে সনাক্ত করেছেন ৩৩ সংখ্যক পদের হাঁড়িতে ভাত নাই (শাস্ত্রীয় পাঠানুযায়ী বাক্যটি : হাড়ীত ভাত নাঁহি ) বাক্যটিকে তিনি খাঁটি বাংলা বলে উল্লেখ করেছেন; তবে দুহিলা দুধু কি বেন্টেষামায় Ñ এই বাক্যের ষামায় শব্দটি তাঁর মতে বাংলায় ব্যবহৃত হলেও সম্বলপুর জেলাতেই এর প্রয়োগ সীমাবদ্ধ দুহিলা দুধ তাঁর বিবেচনায় ওড়িয়া বা বিহারী এছাড়া জঁহি, তঁহি, এথু Ñ এই শব্দগুলোকে  তিনি ওড়িয়া ভাষার মনে করেন চান্দরে, বিষয়রে Ñ এই শব্দগুলোতে অধিকরণের বিভক্তি চিহ্নও তাঁর মতে ওড়িয়া ভাষারইঘড়িএÑ এই ক্রিয়া বিশেষণটি ওড়িয়া ব্যাকরণানুযায়ী নিষ্পন্ন বলে তিনি বিবেচনা করেন ‘বেণি শব্দটি তিনি অপভ্রংশ স্তরের মনে করেন বিজয়চন্দ্র চর্যার ভাষায় হিন্দি বৈশিষ্ট্য ওড়িয়া প্রাধান্যের কথা বললেও এবং এই ভাষাকে সংকর ভাষারূপে বিবেচনা করলেও বাংলার দাবি একেবারেই অস্বীকার করেন নি : I must however say that in some of the songs, Bengali elements predominates. (৩৪)

চর্যাপদের ভাষা নিয়ে প্রথম বিস্তারিত ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা করেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে তিনি সুস্পষ্টভাবে বললেন যে চর্যাপদের ভাষার মূল কাঠামো বাংলা :  The language of the Caryas is the genuine vernacular of Bengal at its base. It belongs to Early or Old NIA. stage.

নব্যভারতীয় আর্যভাষা স্তরের একেবারে প্রথম কালের ভাষা বলে এই স্তরের সব গুণাবলি তখনও এতে পরিস্ফুট হয় নি শব্দগঠনের নিয়ম অনেকটাই মধ্যভারতীয় আর্যভাষা স্তরের রয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে নব্যভারতীয় স্তরের বিভক্তিরূপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পশ্চিমা হিন্দির নিয়মানুযায়ী সকর্মক ক্রিয়ার অতীতরূপ বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হয়েছে

সুনীতিকুমার এই ভাষার উপর শৌরসেনী অপভ্রংশের ব্যাপক প্রভাবও লক্ষ করেছেন মাঝেমধ্যে সংস্কৃত সাহিত্যিক প্রাকৃতের বৈশিষ্ট্যও এতে অব্যাহত ছিল।(৩৫)    

চর্যার জো, সো, কো, জাসু, তাসু’Ñ এই সর্বনামগুলোতে সুনীতিকুমার শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাব সনাক্ত করেছেন প্রাচীন সাহিত্যিক প্রাকৃতের করণ কারকের বিভক্তি চিহ্নও সনাক্ত করেছেন তিনি: যেমন সমাহিঅ’র ইঅ এই প্রভাব একটি ভাষার প্রাথমিক স্তরে অস্বাভাবিক নয় এই প্রভাবের যৌক্তিকতা সম্পর্কে সুনীতিকুমারের মন্তব্য :  It seems that in these Caryas we have the first attempts at literary employment of the Bengali speech. And being the first attempts, the speech is not sure of its own forms, and leans on its stronger, better established (in literary sense) sisters and aunts. The literary languages and models which the poets of the Caryas, Lui and Kanha, Bhusuku and Catila, Saraha and Kukkuri, and the rest, had before them, were Sanskrit, the various literary prakrits (of the Second MIA stage), and Western or Saureseni Apabhransa, and the rich and ever growing literatures in them. Of these the Saureseni Apabhransa was in spirit and form nearest the vernaculars, presenting with them almost a similar stage of  development. Saureseni Apabhransa, again, was the most cultivated literary language based on a slightly archaic form of a contemporary vernacular : and  its influence was paramount from Gujrat to Bengal. Naturally, it may be expected that there would be a great influence exerted by it on the Old Bengali of the period : especially when the latter was practising its first steps, so to say, in the hands of men fully familiar with the former. Hence it is not strange to find a number of Saureseni Apabhransa forms in this offspring of Magadhi Apabhransa. (৩৬)

শৌরসেনী অপভ্রংশের যে প্রভাবের কথা বলা হয়েছে, তার জন্য লিপিকরদেরও কিছুটা দায়ী করেছেন সুনীতিকুমার তাঁর মতে পুথিটি নেপালে লিখিত সে সময নেপালের লিপিকররা বাংলার চেয়ে শৌরসেনী অপভ্রংশে বেশি অভ্যস্থ ছিলেন নেপালে তখন মৈথিলি ভাষার প্রচলন ছিল, এই কারণে চর্যায় বোলথি ভনথির মত মৈথিলি শব্দের প্রয়োগ দেখা গেছে

সুনীতিকুমার তাঁর The Origin and Development of the Bengali Language এর বিভিন্ন অধ্যায়ে বাংলার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে চর্যায় প্রাপ্ত বাংলা ভাষার সাক্ষ্যগুলো বিশ্লেষণ করেছেন তবে, তাঁর এই সব বিশ্লেষণের ব্যাপারে প্রতিবেশী ভাষার পণ্ডিতগণ সন্তুষ্ট হন নি অসমীয়া, ওড়িয়া, মৈথিলি হিন্দিভাষীরাও চর্যার উপর তাঁদের অধিকার দাবি করে বিভিন্ন যুক্তি  উপস্থাপন করতে শুরু করলেন

মৈথিলি পণ্ডিতগণও, আমাদের মতই, চর্যাপদকে তাঁদের সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন রূপে দাবি করেন চর্যার ভাষাকে জয়কান্ত মিশ্র প্রত্ন মৈথিলির একটি উপভাষা হিসেবে দাবি করেছেন : …the language of the Caryapada represents a Proto-Maithili dialect of the Chika-Chiki area, midway between Standard Maithili and Standard Bengali, having some (esp. archaic) features in common with other Magadhan speeches. (৩৭)

এখানে লক্ষণীয় জয়কান্ত মিশ্র চর্যার ভাষাকে চিকাচিকি অঞ্চলের প্রতœ মৈথিলী ভাষা নামে অভিহিত করেছেন পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় সন্ধ্যাভাষাকে ছেকাছেকি অঞ্চলের ভাষা বলে উল্লেখ করেছিলেন জয়কান্ত মিশ্র অন্যত্র বলেছেন : পালরাজারা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রধান সংরক্ষক ছিলেন এবং এই তথ্য প্রাচীন প্রমাণে পুষ্ট যে, শেষ মুখ্য পালরাজার আমলেই বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ৮৪ জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী (সিদ্ধা) সংরক্ষণ এবং প্রোৎসাহন পেয়েছিলেন যাঁরা মৈথিলীতে সুবিখ্যাত চর্যাপদের রচনা করেন এইসব পদের রচয়িতারা যে গুপ্ত গূঢ় জ্ঞানচর্চার একটি ঐতিহ্য রেখে যান, পরবর্তীকালে সেবিষয়ে সবিশেষ অধ্যয়নের ধারা আর দেখা যায় নি।(৩৮) 

রাহুল সাংকৃত্যায়ন চর্যার ভাষায় মৈথিলি প্রভাবের কথা বেশ জোর দিয়েই বলেছেন তাঁর পুরাতত্ত্বনিবন্ধাবলী গ্রন্থে . জয়ধারী সিংহ, পি.কে জয়সওয়াল প্রমুখ পণ্ডিতও চর্যাগানের ওপর মৈথিলি ভাষার দাবি উত্থাপন করেছেন

সুনীতিকুমারের কৃতী ছাত্র অসমীয়া পণ্ডিত বাণীকান্ত কাকতী অসমীয়া ভাষার উদ্ভব ক্রমবিকাশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন তিনি তাঁর Assamese, Its Formation and Development বইতে বৌদ্ধগান দোহায় সংকলিত পুথিগুলোর ভাষাকে অসমীয়া বলে দাবী করতে গিয়ে বলেছেন : Certain phonological and morphological peculiarities registered in Baudha Dohas have come down in an unbroken continuity through the early to modern Assamese. (৩৯)

চর্যা দোহাগুলোর ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যসমূহে অসমীয়া ভাষায় ধারাবাহিক অস্তিত্বের যুক্তি দিয়েছেন বাণীকান্ত অধিকরণে বিভক্তি   প্রয়োগকে(যেমন : সাঙ্কমত, বাটত) তিনি অসমীয়া ভাষার বৈশিষ্ট্যরূপে চিহ্নিত করেছেন অন্যতম দোহা রচয়িতা মীননাথের নিবাস কামরূপে ছিলÑ তা উল্লেখ করেও তিনি তাঁর দাবি জোরালো করার চেষ্টা করেছেন

বাণীকান্ত কাকতীর প্রতিধ্বনি করেছেন বিরিঞ্চি কুমার বড়ুয়া তাঁর  History of Assamese Literature বইতে :       Other specimens of the language in its formative period are manifest in the songs and aphorisms composed by the Buddhist Siddhacaryas between the 8th and 12th centuries A.D. and commonly known as Caryas and Dohas found in Hajar Bacharer Purano Bangla Bhasay Bauddha Gan O Doha and in Dohakos first complied by M.M. Haraprasad Sastri.  Bengali scholars consider these Caryas and Dohas to be the specimens of the early Bengali language only. But careful scruitiny will make it clear that their language commonly called sandhyabhasa (`twilight language’), represents the latest phase of the Magadhi Apabharamsa, and as such it includes to considerable extent the earliest forms of the eastern group of modern  Indo-Aryan Languages, namely Bengali, Assamese, and Oriya. (৪০)  

ওড়িয়াভাষীগণও চর্যার ওপর তাঁদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন মায়াধর মানসিংহ এই প্রসঙ্গে বলেছেন : Though the Assamese, the Bengali and the Oria pundits all claim Baudhagan O Doha of the eight and ninth centuries A.D.as the earliest literary expression in their respective languages, Oria as is spoken and written today, in close parallel to the sister languages of Bengal and Assam, became articulate in about the fourteenth century. (৪১)  

সুকুমার সেন চর্যার ভাষাকে বাংলা বলেই মনে করেন, তবে সুনীতিকুমার যে শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাবের কথা বলেছেন, তাকে তিনি অবহট্ঠের  প্রভাব বলে মনে করেন :

সুনীতিবাবু যে সব পদ শব্দ শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাবজাত বলিয়াছেন সেগুলি সূক্ষ্ম বিচারে অবহট্ঠের যখন চর্যাগীতি রচিত হইতেছিল তখন অবহট্ঠ সমগ্র আর্যভাষী ভারতবর্ষের অন্যতম সাধুভাষা, সংস্কৃতের পরেই তাহার মর্যাদা চর্যাগীতিকবিদের মধ্যে অন্তত দুইজন সরহ কাহ্ন, এই সাধুভাষাতেই দোহা রচনা করিয়াছিলেন চর্যাগীতির সঙ্গে মিলাইয়া পড়িলে দেখা যাইবে অবহট্ঠের সঙ্গে চর্যাগীতির ভাষার সম্বন্ধ কত নিকট ছন্দ তো প্রায় একই সুতরাং বাঙ্গালা ভাষার সেই শিশুকালে অবহট্ঠের শব্দ পদ না থাকাই বিস্ময়ের বিষয় হইত এবং চর্যাগীতির অকৃত্রিমতায় সন্দেহ জাগাইত।(৪২)

চর্যাপদের ভাষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ চর্যাপদের ভাষা নিয়ে অন্যভাষী পণ্ডিতদের দাবি তিনি পর্যালোচনা করেছেন চর্যার ভাষা সম্পর্কে সাত রকমের মত উত্থাপিত হয় : . চর্যাপদগুলো কোন নির্দিষ্ট ভাষায় রচিত নয়, এর ভাষা কৃত্রিম, খিচুড়ি ভাষা; . এর ভাষা অপভ্রংশ;         . এই ভাষা হিন্দি: . চর্যা ওড়িয়া ভাষায় রচিত; . চর্যার ভাষা অসমীয়া: . এর ভাষা বাংলা

শহীদুল্লাহ্ উল্লিখিত প্রতিটি মতের পর্যালোচনা করেছেন এবং চর্যার ভাষাকে বাংলা বলে সাব্যস্ত করেছেন তবে তিনি খানিকটা সতর্ক হয়ে একে বলেছেন বঙ্গকামরূপীভাষা শহীদুল্লাহ তাঁর আলোচনায় অন্যভাষীদের দাবিও অনেকটা স্বীকার করে নিয়েছেন শান্তিপাদের ভাষা মৈথিলি হতে পারে Ñ এই সম্ভাবনা তিনি স্বীকার করেছেন; আর্যদেবের ভাষা ওড়িয়া হওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।(৪৩)

চর্যার ভাষা নিয়ে একেবারেই স্বতন্ত্র কথা বলেছেন আহমদ শরীফ তিনি চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা বলে স্বীকার করেন নি তাঁর মতে-

চর্যাগীতি যে প্রাচীন বাংলা তাআজো সর্বজনস্বীকৃত নয় হিন্দি, মৈথিল, উড়িয়া, অসমীয়াও এর দাবীদার ডক্টর শহীদুল্লাহ্, ডক্টর সুকুমার সেন, অধ্যাপক প্রিয়রঞ্জন সেন প্রমুখ বাঙালি বিদ্বানেরাও ওদের দাবির আংশিক স্বীকৃতি দিয়েছেন সব সিদ্ধার বাড়ি বাঙলায় নয়, বাঙলা তখনো শালীন লেখ্য সাহিত্যের ভাষা নয়, আঞ্চলিক বুলি মাত্র কাজেই উড়িষ্যার, মিথিলার কিংবা আসামের লোকের বাঙলা পদ রচনার সাধসাধ্য থাকার কথা নয় অতএব সিদ্ধান্ত করতে হয় যে, চর্যাপদ অর্বাচীন প্রাচ্য (গৌড়ী?) অবহট্ঠে রচিত।(৪৪)

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় চর্যার ভাষাকে পশ্চিমবঙ্গীয় বাংলা বলে দাবি করেছেন : The Language of the Caryas seems to be based on a West Bengal dialect. Some of its forms belong to West Bengal than to East Bengal. (৪৫)

সুনীতিকুমার তাঁর এই দাবির সমর্থনে কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছেন সাথ এর পরিবর্তে সঙ্গ বা সম প্রয়োগকে তিনি পশ্চিমবঙ্গীয় প্রবণতারূপে উল্লেখ করেছেন তাঁর এই মত শহীদুল্লাহ সমর্থন করেন নি সৈয়দ মুর্তাজা আলী এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে এই ভাষায় পূর্ববঙ্গীয় প্রভাবের বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন : ডক্টর সুনীতিকুমারের মতে চর্যাপদের ভাষা পশ্চিমবঙ্গের চর্যাপদে কিন্তু পূর্ববঙ্গের অসমীয়া ভাষার অনেক শব্দের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় এই সকল অপ্রচলিত শব্দের অধিকাংশ পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত হয় না।(৪৬)  

সৈয়দ মুর্তাজা আলী নাস্তিবাচক বাক্যে ক্রিয়ার পূর্বে না ব্যবহার, সপ্তমী বিভক্তিরূপে প্রয়োগÑ এইসব বৈশিষ্ট্যকে অসমীয়া ভাষার লক্ষণরূপে দাবি করেছেন চর্যাপদে উল্লিখিত ভৌগোলিক স্থানের বেশ কয়েকটি আসামে অবস্থিতÑ এই যুক্তিতেও তিনি চর্যার ভাষায় পূর্ববঙ্গীয় লক্ষণের দাবিকে জোরালো করার চেষ্টা করেছেন

চর্যার ভাষা সম্পর্কে বিভিন্ন পণ্ডিতের মতামত পর্যালোচনা করে এবং চর্যাপদগুলো অধ্যয়ন করে আমরা এই পদগুলোর ভাষা মূলত বাংলা বলেই মনে করি তবে, এতে নব্যভারতীয় আর্যভাষার  অন্তর্গত প্রতিবেশী কয়েকটি ভাষার বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না অসমীয়া বাংলা দুটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিকশিত হয়েছে ষোড়শ শতকের পর থেকে, ওড়িয়া চতুর্দশ শতক থেকে ভিন্ন ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে থাকে চর্যাগুলোর রচনাকাল বিবেচনা করলে চর্যার ঐতিহ্যের অধিকার এই দুটি ভাষার জনগণকে দিতে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয় চর্যাপদগুলোতে যে ভূগোলের পরিচয় পাই, যে জীবনযাত্রার ছবি মেলে তাতেও এগুলো  মূলত বাংলারই সম্পদ বলে দাবি করতে আমাদের দ্বিধান্বিত হওয়ার কারণ নেই

চর্যার পুথিটি কোথায় লিখিত হয়েছিল? এই প্রশ্ন নিয়েও মতপার্থক্য দেখা গেছে সুনীতিকুমার মনে করেন পুথিটি নেপালে লিখিত চর্যার ভাষায় মৈথিলি প্রভাবের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি পুথিটি নেপালে লিখিত হওয়াই এর কারণ বলে উল্লেখ করেছেন।(৪৭) তাছাড়া নেপালে লিখিত হওয়ার কারণে স্বরাঘাতের ক্ষেত্রে নব্যভারতীয় আর্যভাষার উত্তরাঞ্চলের প্রভাব পরিলক্ষিত হওয়ার কথাও বলেছেন তিনি : In the Carya-padas, there are a number of forms showing, from the arrangements of vowels, the normal NIA stress : it is quite likely that from the fact of the MS. of the Caryas having been written  in Nepal, the characteristic stress and quantity of Northern NIA. have insinuated themselves in these cases. (৪৮)  

সুকুমার সেন অবশ্য চর্যার পুথিটি বাংলাদেশেই লিখিত হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন : চর্যার  পুথি  বাংলা অক্ষরে  লেখা, লিপিকাজ বাঙ্গালাদেশে হইয়াছে বলিয়া অনুমান করিতে পারি।(৪৯)

তবে  চর্যার অক্ষর বাংলা কি না এই নিয়ে অনেকের সংশয় আছে পুথিতে কোন কোন জায়গায় নেওয়ারি হরফ আছে এই জন্য কেউ কেউ এটি নেওয়ারি অক্ষরে লিখিত বলে মনে করেন পুথি নেপালে লিখিত হয়েছিল এই ধারণা থেকেই নেওয়ারী অক্ষরের কথা উঠেছে এই দাবি দৃঢ়ভাবে  অগ্রাহ্য করেছেন তারাপদ মুখোপাধ্যায়।(৫০)

পুথির লিপিকাল নিয়েও ঐক্যমত্য নেই রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই পুথির লিপিকাল শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তনের চেয়ে প্রাচীনতর নয় বলে সন্দেহ করেছেন।(৫১) সুকুমার সেনের অনুমান অনুযায়ী এর লিপিকাল চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে

চর্যাপদের রচনাকাল নিয়েও বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন পণ্ডিতগণ প্রাচীনকালের রচনার কাল নিরূপণের ক্ষেত্রে রচয়িতাদের জীবৎকালই প্রধান সহায় সেই সঙ্গে কিছু অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য বিচার করা যেতে পারে কিন্তু চর্যার কবিদের জীবৎকাল নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে ঐক্যমত্য নেই শহীদুল্লাহ্ লুইপার কাল উল্লেখ করেছেন ৭৩০ থেকে ৮১০ সালের মধ্যে(৫২) ; বিনয়তোষ ভট্টাচার্যের মতে তাঁর জন্ম ৬৬৯ সালে(৫৩) এবং সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে তাঁর জীবৎকাল দশম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে।(৫৪) এরকম মতপার্থক্য অন্যান্য পদকর্তার ব্যাপারেও আছে

পদকর্তাদের জীবৎকালের বিবেচনায় শহীদুল্লাহ মনে করেন, সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগেই বাংলা সাহিত্যের উৎপত্তি হয়েছিল তাঁর মতে : আশ্চর্যচর্যাচয়ে আনুমানিক ৬৫০ হইতে ১১০০ খ্রীষ্টাব্দের ভাষা লিপিবদ্ধ হইয়াছে।(৫৫) সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, চর্যাপদের  রচনাকাল ৯৫০ থেকে ১২০০ সাল।(৫৬)  বাংলা সাহিত্যের গবেষকগণ এখনও চর্যার রচনাকাল নিয়ে উপরিউক্ত দুটি মতে বিভক্ত

চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় বা আশ্চর্যচর্যাচয়ে তেইশজন পদকর্তার পদ পাওয়া যায় এঁরা সকলেই ছিলেন বৌদ্ধসাধকÑ মহাযান শাখার অনুসারী মহাযান শাখার বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মধ্যে একসময় তন্ত্রসাধনার বিস্তার ঘটে কালচক্রযান, বজ্রযান সহজযান Ñ এই তিনটি ধারার চর্যাই তাঁদের মধ্যে দেখা যায় চর্যাগানগুলো এই সাধকদেরই সাধনসংগীত চর্যাগুলোতে ধর্মের দার্শনিক উপলব্ধি যেমন আছে, তেমনই আছে তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতির ইঙ্গিতও এই জগৎ জীবনের অনিত্যতার উপলব্ধিই তাঁদের জীবনদর্শনের মূল কথা জগৎ তাঁদের কাছে অনুৎপন্ন সত্য জগৎ যে অনুৎপন্ন সত্যের মতÑ চমৎকার কাব্যময় উপমা দিয়ে তা ব্যাখ্যা করেছেন ভুসুকু :

আইএ অনুঅনা জগ রে ভাংতিএ সো পড়িহাই

রাজ সাপ দেখি জো চমকিই সাচে কি তা বোড়ো থাই

অকট জোইআ রে মা কর হথা লোণা

অইস সহাবেঁ জই জগ বুঝসি তুটই বাসণা তোরা

মরুমরীচি, গন্ধব্বনঅরী দপ্পণপড়িবিম্বু জইসা

বাতাবত্তেঁ সো দিঢ় ভইআ আপ পাথর জইসা

ঝাঞ্ঝি সুআ জিম কেলি করই খেলই বহুবিহ খেড়া

বালুআ তেলেঁ সসর সিংগে আকাশ ফুলিলা

রাউতু ভণই কট ভুসুকু ভণই কট সঅলা অইস সহাব

জই তো মূঢ়া আছসি ভান্তি পূছতু সদগুরু পাব ॥(৫৭)

আদিতে অনুৎপন্ন এই জগতকে ভ্রান্তিবশত আমরা সত্য জ্ঞান করি রজ্জুকে সর্প ভেবে ভয় পাওয়ার মতই জগতের অস্তিত্ব দেখে আমরা বিচলিত হই মরুমরীচিকা, গন্ধর্বনগরী, দর্পণের প্রতিবিম্বের মতই আমাদের দৃশ্যমান জগৎ অলীক বন্ধ্যার ক্রীড়ারত পুত্র, বালি থেকে উৎপন্ন তেল, শশকের শৃঙ্গ, আকাশে প্রস্ফুটিত পুষ্প যেমন অসম্ভব, জগতের অস্তিত্বও তেমনই অবাস্তব মূঢ়তাবশতই আমরা এই অসম্ভব অনুৎপন্ন জগতকে সত্য জ্ঞান করি

অনুৎপন্ন জগতের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার ফলেই ভব নির্বাণের দ্বৈত অস্তিত্বের ভ্রান্তিতে নিমগ্ন হই আমরা জগৎ অনুৎপন্ন হলে তো ভব নির্বাণের দ্বৈতরূপ  নিয়ে আমাদের ভাববার কথা নয় অথচ আমরা নিজেরাই ভাব নির্বাণের পার্থক্য রচনা করে জগতের ভ্রান্ত অস্তিত্বের বন্ধনে নিজেদের জড়িয়ে ফেলি এই আক্ষেপই করেছেন সরহপা :

আপণে রচি রচি ভব নিব্বাণা

মিছে লোঅ বন্ধাবই আপণা ॥(৫৮)

ভব নির্বাণের পার্থক্য জ্ঞান না থাকলে জীবন মৃত্যুর ভাবনাও অবান্তর :

জইসো জাম মরণ বি তইসো

জীবন্তে মইলে ণাহি বিশেসো ॥(৫৯)

জগতের অনিত্যতা অনুৎপন্নতার কথা বিস্মৃত হয়েই মানুষ জগতের নানা মোহে জড়িয়ে পড়ে বৃক্ষের ডালের মতই আমাদের শরীরবৃক্ষের পাঁচটি ইন্দ্রিয়কে বিবেচনা করেছেন লুইপা এই ইন্দ্রিয়ের প্ররোচনাতেই জাগতিক সুখ তৃপ্তির কামনায় চিত্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে জাগতিক মোহ কামনায় বিচলিত চিত্ত আমাদের বিভ্রান্ত করে এই বিচলিতস্বভাব চিত্তকে নিঃস্বভাব করে, চিত্তকে অচিত্ততায় লীন করে শূন্যতার পথ অবলম্বনই প্রকৃত সাধকের পথ এই শূন্যতাই মহাসুখের পথ Ñ বৌদ্ধ পরিভাষায় নির্বাণ লুইপা এই তত্ত্বই প্রকাশ করেছেন  :

কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল

চঞ্চল চীএ পইঠা কাল 

দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ

লূই ভণই গুরু পূছিঅ জাণ ॥(৬০)

নির্বাণ লাভের জন্য মোহতরুর বিনাশের কথা বলেছে চাটিলপাও মোহতরু ফাড়তে হবে অদ্বয় নির্বাণকুঠার দিয়ে ভবনদী পেরিয়ে নির্বাণপথে যাওয়ার সাঁকো তৈরি করতে হবে সেই মোহতরু ফেলে তবে সাধনার পদে পদে বিচ্যুতির প্রলোভন থাকবে দক্ষিণবামে না তাকিয়ে একাগ্র নিষ্ঠায় যেতে হবে নির্বাণের পথেÑ এই সতর্কবাণীও উচ্চারিত হয়েছে চাটিলের পদে :

ভব ণই গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী

দু আন্তে চিখিল মাঝেঁ না থাহী

ধামার্থে চাটিল সাঙ্কম গঢ়ই

পারগামি লোঅ নীভর তরই 

ফাঁড়িও মোহতরু পাটী জোড়িঅ

অদঅ দিঢ়ি নিবাণে জোড়িঅ 

সাঙ্কমত চড়িলে দাহিণ বাম মা হোহি

নিঅড়ি বোহি দূর মা জাহি ॥(৬১)

আলিকালির অর্থ স্বরবর্ণব্যঞ্জনবর্ণ তান্ত্রিক ভাষায় ইড়াপিঙ্গলা পদকর্তাদের অনেকেই ছিলেন তান্ত্রিকবৌদ্ধ তন্ত্রসাধনার পরিভাষা দিয়েই তাঁরা তাঁদের তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন তন্ত্রসাধনায় ইড়াপিঙ্গলাসুষুম্না নাড়িত্রয়ের প্রয়োগ আছে সুষুম্নার প্রত্যক্ষ যোগ মস্তিষ্কের সঙ্গে ইড়াপিঙ্গলার পথে মস্তিষ্কে যোগ স্থাপন করা যায় না সুষুম্নার পথ ধরেই কেবল তা সম্ভব আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা’ Ñ এর অর্থ স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে পথ রুদ্ধ হয়ে গেল এই উক্তি  দিয়ে বোঝানো হচ্ছে ইড়াপিঙ্গলার পথে মহাসুখচক্রে যাওয়া যাবে না সাধকগণ মস্তিষ্ককেই মহাসুখচক্রের আধাররূপে বিবেচনা করেছেন মহাসুখেরই অন্য নাম নির্বাণ তান্ত্রিক পরিভাষায় ব্যক্ত এই কথার অর্থÑ ভব নির্বাণের দ্বৈতজ্ঞানের অস্তিত্ত্ব থাকলে নির্বাণ লাভ সম্ভব নয় এই জন্য অদ্বয় সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে চর্যার অনেক পদকর্তাই এই কথা বলেছেন নানা পরিভাষা দিয়ে লুইপা যখন বলেন :

ভনই লূই আমহে ঝাণে দীঠা

ধমণ চবণ বেণি পিণ্ডী বইঠা ॥(৬৩)

তখন তিনি ধ্যানমগ্ন হয়ে ধমণ চবণকে বা নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে সাধনার প্রকৃত পথ শূন্যতাকে উপলব্ধি করার কথাই বোঝান ধমণচবণের তান্ত্রিক অর্থের সীমানা ছাড়িয়ে গেলেই ভব নির্বাণের দ্বৈত জগতের কথা আমাদের মনে পড়বে

চর্যার পদকর্তারা ধর্মসংগীত হিসেবেই এগুলো রচনা করেছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু জগতের অনুৎপন্নতার কথা বলতে গিয়েও তাঁরা জাগতিক পারিপার্শ্বিকতাকে উপেক্ষা করতে পারেন নি তত্ত্ব বোঝানোর জন্য তাঁরা জনজীবনের নানা উপাদানকে ব্যবহার করেছেন অবলীলায় এর ফলে আমরা তাঁদের সমকালীন জীবন পরিপার্শে¦  কথাও জানতে পেরেছি এই সাধকগণ চিত্ত বোঝানোর জন্য ব্যবহার করেছেন হরিণ, হাতি, ভাতের শূন্য হাড়ি Ñ এই সব আমাদের পরিচিত প্রাণী বস্তুকে ভুসুকুর রচনায় আমরা পাই :

হরিণা বোলই হরিণা সুন তো

বন ছাড়ী হোহু ভান্তো ॥(৬৪)

এখানে এই জগতের বন ছেড়ে চিত্তকে অন্যত্র পালিয়ে যাবার জন্য হরিণকে পরামর্শ দিচ্ছে হরিণী অর্থাৎ চিত্তকে নিঃস্বভাব করে, জাগতিক বন্ধনমুক্ত করে নির্বাণের পথে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন নৈরাত্মা দেবী নৈরাত্মা দেবীর প্রসঙ্গ চর্যায় বার বার এসেছে আত্মা নেই  যে দেবীর তিনিই নৈরাত্মা নৈরাত্মা কখনো হরিণীরূপে, কখনো কুশলী বাদ্যকরীরূপে, কখনো নৃত্যপটিয়সী ডোম্বীরূপে, কখনো কামকাতর বধূরূপে, কখনো চণ্ডালিণীরূপে, আবার কখনো সুন্দরী বালিকার বেশে সাধকের সান্নিধ্যে এসে তাঁকে নির্বাণের পথে আহবান করেছে, সাধনার প্রকৃত সত্য উপলব্ধিতে তাঁকে সাহায্য করেছে

জাগতিক পরিবেশকে উপেক্ষা করতে পারেন নি বলেই চর্যাপদকর্তারা তাঁদের ইপ্সিত লক্ষ্যের বাইরের অনেক কথাই আমাদের জানিয়ে গেছেন হাজার বছরের প্রাচীন বাংলার জনজীবনের কথা ফুটে উঠেছে তাঁদের রচনায় কর্ণালঙ্কার চোরের কথা জেনেছি আমরা কুক্কুরীপার রচনায় তিনিই জানিয়েছেন নিশীথ রাতে গৃহবধূর কামসাধনায় যাওয়ার কথা :

সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগই

কানেট চোরে নিল কা গই মাগই

দিবসহি বহুড়ী কাইহি ডর ভাই

রাতি ভইলে কামরু জাই (৬৫)

হাজার বছর আগেও মদমত্ত হতে চাইতেন অনেকে তাদের জন্য শুণ্ডিণী মদ চোলাই করতো সেই মদ খেয়ে নিঃসাড় হয়ে যেত অনেকেই বিরুবাপার রচনায় তেমন চিত্রই পাই আমরা :

এক সে শুণ্ডিণী দুই ঘরে সান্ধই

চীঅণ বাকলত বারুণী বান্ধই ॥(৬৬)

হরিণ শিকারের চিত্র পেয়েছি ভুসুকুর পদে, হাতিকে বেঁধে রাখার কথাও জেনেছি কাহ্ণপার পদে জেনেছি নগরের বাইরে বসবাসরতা অস্পৃশ্যা ডোম্বির কথা, তার জন্য নেড়ে ব্রাহ্মণের উতলা, নির্ঘিণ বিবস্ত্র হওয়ার কথাও এই ডোম্বী চৌষট্টি পাঁপড়ির উপর তার নৃত্যকুশলতা প্রদর্শন করতে পারে  কৃষ্ণপা এরকম একটি চমৎকার দৃশ্য উপহার দিয়েছেন :

নগর বাহিরি রে ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ

ছোই ছোই জাসি বামহণ নাড়িআ

আলো ডোম্বী তোএ সম করিব মো সাঙ্গ

নিঘিণ কাহ্ণ কাপালি জোই লাঙ্গ

এক সো পদমা চউসট্ঠী পাখুড়ি

তহিঁ চড়ি নাচই ডোম্বী বাপুড়ি ॥(৬৭)

এই অস্পৃশ্য ডোম্বীদের কথা বলতে গিয়ে সুকুমার সেন চমৎকৃত হওয়ার মত বেশ কিছু তথ্য জানিয়েছেন তাঁর মতে এই ডোম্বী রমণীরা বাস করত সমতটে কহ্ণনের রাজতরঙ্গিণীর সূত্রে জানা যায়, কামরূপকামতা অঞ্চলে খ্রিস্টিয় প্রথম দুই সহস্রাব্দের দিকে নৃত্যগীতবাদ্যে বেশ উৎকর্ষ দেখা দিয়েছিল চতুর্দশপঞ্চদশ শতকে সিলেট অঞ্চলেও এই ধরনের শিল্পকুশলতার বিস্তার ঘটেছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে তথ্য সুকুমার সেন জানাচ্ছেন তা হল, এই ডোমডোমনিদের বেশ কয়েকটি দল খ্রিস্টিয় দ্বিতীয়তৃতীয় শতকে এই সমতট থেকেই পাড়ি জমায় ইরানে

সেখান থেকে তারা ইউরোপ মধ্য এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এরা এখনও নিজেদের ভাষা অনেকটাই অবিকৃত রেখেছে এদেরই ইংরেজিতে বলা হয় জিপসি পুরুষ মানুষকে এদের ভাষায় বলা হয় রোম এই রোম কথাটার উৎপত্তি ডোম্ব শব্দ থেকে চমকে ওঠার মত যে কথা সুকুমার সেন জানিয়েছেন তা হল, এই জিপসিদের মূল ভাষা বাংলা তাঁর মতে : যে মধ্য ভারতীয় আর্যভাষা থেকে বাংলা বেরিয়েছিল সেই ভাষা থেকে এদের ভাষাগুলিও বিভিন্ন অঞ্চলে পরিণাম লাভ করেছিল

গঙ্গাযমুনা নদী পদ্মা খালে নৌকা চলার কথায় ভেসে ওঠে চিরপরিচিত বাংলাদেশের জীবনচিত্র কানু ডোম্বীর বিয়ের প্রসঙ্গে যৌতুকের উল্লেখ আছে, তবে সেই যৌতুক মেটানো হয়েছে অনুত্তরধর্ম দিয়ে তুলোধুনার কথা আছে, আছে তাঁতির প্রসঙ্গ পর্বত শিখরে ময়ূরপুচ্ছ পরিধানকারী সুন্দরী শবরী বালিকার চিত্রময় বর্ণনা যেমন আছে তেমনই আছে টিলায় বসবাসকারী অভাবী মানুষের নিরন্ন জীবনের করুণ চিত্র ধর্মতত্ত্বে প্রবেশ করতে না চাইলেও ক্ষতি নেই চর্যায় আমরা হাজার বছরের প্রাচীন বঙ্গদেশের যে জীবন সমাজের পরিচয় পাই তাও কম পাওয়া নয়

চর্যাপদগুলো ধর্মসংগীত হলেও সাহিত্য বিচারেও এগুলোর মূল্য গৌণ নয় এই বিচারেই এগুলোকে আমরা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শনরূপে গণ্য করি কাব্যগুণাম্বিত এই পদগুলোর ছন্দ, উপমা প্রয়োগে রচয়িতাদের কুশলতা, ভাবের গাম্ভীর্য দেখে মনে হয় না চর্যাগুলো কোনো সাহিত্যের প্রাথমিক কালের প্রয়াস চর্যাগুলোর ছন্দবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সুকুমার সেন বলেছেন এগুলো পাদাকুলকপজ্ঝটিকাদোহাড়িকাপদ্ধড়ীচউপাউ ছন্দে রচিত ছন্দগুলা অবহট্ঠ থেকে আগত তবে, অবহট্ঠের স্বরের হ্রস্ব দীর্ঘমাত্রার শৃঙ্খলা নেই এখানে সমমাত্রার প্রয়োগই বেশি অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় চর্যার ছন্দে বাংলার প্রাচীন পয়ার লাচাড়ি ছন্দের প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেছেন আবদুল কাদিরের মতে, ‘‘চর্যাপদে পজ্ঝটিকা, পাদাকুলক, দোহারিকা, গাথা, আর্যা প্রভৃতি বিভিন্ন মাত্রাছন্দের খণ্ডিত, বিকৃত বিমিশ্রিত রূপ দেখা যায়

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পর রাহুল সাংকৃত্যায়ন পেয়েছিলেন চর্যাগানের কুড়িটি পদ ১৯৬৩ সালে শশিভূষণ দাশগুপ্ত আবিষ্কার করেছে আরও দুইশত পঞ্চাশটি পদ সেগুলো থেকে তিনি একশটি পদ বাছাই করে একটি সংকলন তৈরি করছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর, ১৯৮৯ সালে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেই সংকলনটি প্রকাশিত হয় নবচর্যাপদ নামে

বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন পেয়েছি আমরা এই চর্যাপদগুলোতেই বাংলা ভাষা তখনও পরিপূর্ণরূপ নিয়ে পরিস্ফুত হয় নি  অসমীয়া ওড়িয়া এমনকি মৈথিলিরও কিছু কিছু প্রভাব রয়ে গেছে সাংকেতিক ভাষায় রচিত বলে  পদগুলোর অর্থ অনুধাবনেও বেশ অসুবিধে হয় তবু বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন বলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম চর্যার সাড়ে ছেচল্লিশটি পদের মধ্যে প্রাচীন বাংলার ভাষা, জীবন সমাজের যে পরিচয় পাওয়া যায় তার গুরুত্ব অপরিমেয় আমাদের ভাষাজীবনইতিহাসসংস্কৃতি চর্যার আকর হিসেবে চর্যা আরও বহুকাল গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হবে তবে, চর্যাপদে বিবৃত সকল বিষয় অনুধাবনের জন্য অধ্যয়নের বিভিন্ন শৃঙ্খলার সমন্বয় প্রয়োজন ভাষাবিদ, ইতিহাসবিদ, নৃবিজ্ঞানী, সমাজতত্ত্ববিদ Ñ এরকম নানা বিদ্যার অধ্যয়নকর্মীর সমন্বিত প্রয়াসেই চর্যাপদের বিষয়াবলী অনুধাবন করা যাবে চর্যাপদ আবিষ্কারের এই শতবর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে আমরা এই প্রত্যাশা নিশ্চয়ই করতে পারি যে, বাংলাভাষী বিদ্বৎ সমাজ এই রকম একটি উদ্যোগ গ্রহণে কুণ্ঠিত হবেন না

তথ্যনির্দেশ

. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান দোহাবঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎকলিকাতা, ১৪১৩, পৃ.

. , পৃ.

. , পৃ.

. Suniti Kumar Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, vol-1, Calcutta, 1985, p. 112

. Ibid, p. 111

. Bijaychandra Majumdar, The History of the Bengali Language, Calcutta, 1920, p. 241

. Vidhusekhara Bhattacharya, is it Caryacaryaviniscaya or Ascaryacaryacaya, Indian Historical Quarterly, vol-VI, pp. 169-170

. Ibid,  p. 170

. Prabodh Chandra Bagchi and Shanti Bhiks u(ed)Shanti Bhikshu Shastri, Preface of Caryagitikos a, p.xi

১০. প্রবোধচন্দ্র বাগচী, ‘‘চর্যাগীতি’’, প্রবন্ধ সংগ্রহ, পশ্চিবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ২০০১, পৃ. ১১

১১. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান দোহা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলিকাতা, ১৪১৩. পৃ.

১২. , পৃ.

১৩. ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত, পাঁচকড়ি রচনাবলী (প্রথম খণ্ড), সিদ্ধাচার্যগণ, কলিকাতা, ১৩৭০,পৃ. ৯৮

১৪. Vidhusekhara Bhattacharya, Sandhabhasa, Indian Historical Quarterly, vol-IV, p. 289

১৫. Prabodh Chandra Bagchi, “The Sandhabhasa and Sandhavacana”, Studies in the Tantras, part I, Calcutta, 1975, p. 27

১৬. শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ‘‘চর্যাপদের সন্ধ্যা বা সন্ধা ভাষা, বৌদ্ধধর্ম চর্যাগীতি, কলকাতা, ১৩৯০, পৃ. ১২৭

১৭.  Muhammad Shahidullah, “Text 40” Buddhist Mystic Songs, Dhaka, 1966, p. 113

১৮. Muhammad Shahidullah, “Text 7” Budhist Mystic Songs, Dhaka, 1966, p. 21

১৯. Muhammad Shahidullah, “Text 2” Budhist Mystic Songs, Dhaka, 1966, p. 4

২০. ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ‘‘প্রথম যুগের চর্যাগীতিপদাবলী প্রাচীন বাঙ্গালা লেখমালা’’, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা  ভাষায় বৌদ্ধগান দোহা, মহাবোধি বুক এজেন্সি, কলিকাতা, ১৪০৭, পৃ. ১১

২১হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান দোহা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলিকাতা, ১৪১৩. পৃ.

২২. , পৃ.

২৩. Muhammad Shahidullah, “Text 2” Buddhist Mystic Songs, Dhaka, 1966, p. 1

২৪. Probodh Chandra Bagchi, “Materials for a Critical Edition of the Old Bengali Caryapadas”, Journal of the Department of Letters, Vol. XXX, Calcutta University, 1938, p. 107

২৫. Prabodh Chandra Bagchi and Shanti Bhiks u Shastri, Caryagitikos a,Visva Bharati, 1956, p. 5

২৬. Probodh Chandra Bagchi, “Materials for a Critical Edition of the Old Bengali Caryapadas”, Journal of the Department of Letters, Vol. XXX, Calcutta University, 1938, p. 108

২৭. সুকুমার সেন, চর্যাগীতিপদাবলী, কলিকাতা, ১৯৭৩, পৃ . ৬১

২৮. নীলরতন সেন, চর্যাগীতিকোষ, কলকাতা, ২০০১, পৃ.

২৯. , পৃ. ১২৯

৩০. Suniti Kumar Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, vol-I, Calcutta, 1985, p. 117

৩১. মনীন্দ্র মোহন বসু, চর্য্যাপদ, কলিকাতা, ১৯৬৬, পৃ.

৩২. নরেন্দ্রনাথ লাহা সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত হরপ্রসাদসংবর্দ্ধনলেখমালা, প্রথম খণ্ড, (কলিকাতা ১৩৩৯), ‘‘তিব্বতী ভাষায় কয়েকটি বৌদ্ধগান শীর্ষক প্রবন্ধে অনাথ নাথ বসু এই দুটি গীতিকা সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন এবং এগুলোর তিব্বতী পাঠ বাংলা অনুবাদ প্রদান করেছেন পৃ. ৯১৯৯

৩৩. Bijaychandra Majumdar, The History of the Bengali Language, Calcutta, 1920, p. 242   

৩৪. Ibid, p. 243

৩৫. Suniti Kumar Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, vol-I, Calcutta, 1985, p. 115

৩৬. Ibid, p. 116

৩৭. Jayakanta Mishra, A History of Maithili Literature, All India Maithili Sahitya Samity, Alahabad, 1949, p. 110

৩৮. জয়কান্ত মিশ্র, মৈথিলী সাহিত্যের ইতিহাস (অনুবাদ : উদয় নারায়ণ সিংহ), সাহিত্য অকাদেমি, নতুন দিল্লি, ২০০২, পৃ. ২৩.

৩৯. Banikanta Kakati, Assamese, Its Formation and Development, Shilong, 1972, p. 11

৪০. Birinchi Kumar Barua, History of Assamese Literature, Sahitya Akademi, New Delhi, 1964, p. 7

৪১. Mayadhar Mansinha, “Oriya Literature”, Contemporary Indian Literature, Sahitya Akademi, New Delhi, 1959, p. 170

৪২. সুকুমার সেন, চর্যাগীতিপদাবলী, কলিকাতা, ১৯৭৩, পৃ. ৪৯

৪৩. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ‘‘বাংলা সাহিত্যের কথা’’, প্রথম খণ্ড, শহীদুল্লাহ রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৫, পৃ. ৬৩৬৬

৪৪. আহমদ শরীফ, বাঙালী বাঙলা সাহিত্য, প্রথম খণ্ড, বর্ণমিছিল, ঢাকা, ১৯৭৮, পৃ. ১৭৬৭৭

৪৫. Suniti Kumar Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, vol-I, Calcutta, 1985, p.117

৪৬. সৈয়দ মুর্তাজা আলী, ‘‘চর্যাপদের ভাষা, সাহিত্য পত্রিকা, সপ্তম বর্ষ : দ্বিতীয় সংখ্যা (শীত সংখ্যা), বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩৭০, পৃ. ৮৭

৪৭. Suniti Kumar Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, vol –I, Calcutta, 1985, p. 117

৪৮.  Ibid, p. 281

৪৯. সুকুমার সেন, চর্যাগীতিপদাবলী, কলিকাতা, ১৯৭৩, পৃ. ৫০

৫০. তারাপদ মুখোপাধ্যায়, চর্যাগীতি, কলিকাতা, ১৩৮৫, পৃ. ৬২৬৩

৫১. বসন্তরঞ্জনরায় বিদ্বদ্বল্লভ (সম্পা), শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন গ্রন্থে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘‘শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন পুথির লিপিকাল, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলিকাতা, ১৩৮৫, পৃ.

৫২. Muhammad Shahidullah, ‘Text 41, “Buddhist Mystic Songs, Dhaka, 1966, p. IV

৫৩. Benoytosh Bhattacarya, In Introduction of Buddhist Esoterism, Motilal Banarasidas, Delhi,1980.p. 65

৫৪. Suniti Kumar Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, vol-I, Calcutta, 1985, p. 120

৫৫. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’, প্রথম খণ্ড, শহীদুল্লাহ রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড) বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৫, পৃ. ১১

৫৬. Suniti Kumar Chatterji, The Origin and Development of the Bengali Language, vol-I, Calcutta , 1985, p. 123

৫৭. Muhammad Shahidullah, ‘Text 41, “Buddhist Mystic Songs, Dhaka, 1966, p. 116

৫৮. Muhammad Shahidullah, ‘Text 2, Ibid, p. 68

৫৯. Muhammad Shahidullah, ‘Text 22, Ibid, p. 68

৬০. Muhammad Shahidullah, ‘Text 1, Ibid,, p. 1

৬১. Muhammad Shahidullah, ‘Text 5, Ibid, p. 15

৬২. Muhammad Shahidullah, ‘Text 7, Ibid, p. 21

৬৩. Muhammad Shahidullah, ‘Text 1, Ibid, p. 1

৬৪. Muhammad Shahidullah, ‘Text 6, Ibid, p. 18

৬৫. Muhammad Shahidullah, ‘Text 2, Ibid, p. 4

৬৬. Muhammad Shahidullah, ‘Text 3, Ibid, p. 8

৬৭.  Muhammad Shahidullah, ‘Text 10, Ibid, p. 30

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Total Post : 260