৩০শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার, বিকাল ৪:৩০
সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘‘জাগরী’’ উপন্যাস
সোমবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৩

মিল্টন বিশ্বাস ।।

বাংলা উপন্যাসের পটভূমিতে সতীনাথ  ভাদুড়ী (১৯০৬-১৯৬৫) একক, স্বয়ংসম্পূর্ণ এক ‘লেখকের লেখক’ হিসেবে পরিচিত। কারণ তিরিশোত্তর কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর, মানিক, বনফুল, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের মতো পাশ্চাত্য ভাবধারা পুষ্ট, নরনারীর সম্পর্ক এবং তাদের জৈব কামনা-বাসনার অত্যাধুনিক বিশ্লেষণ, যুগসন্ধির অবক্ষয়িত স্বরূপ প্রকাশে তিনি ব্যস্ত ছিলেন না। আবার ঐতিহ্যবিরোধী কিংবা নিচুতলার জীবন চিত্রণই আধুনিক উপন্যাসের মৌল প্রতিপাদ্য এ বিষয়েও তাঁর বিশ্বাস ছিলো না। অন্যদিকে আবার সমসাময়িক বাংলা কথাসাহিত্যের পাশ্চাত্য মনোবিজ্ঞানের বহুল ব্যবহৃত অবকাঠামো অথবা ফরাসি সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠকের তাত্ত্বিক প্রভাব কোনোটিই তাঁর উপন্যাসে সুলভ নয়। মূলত তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালের লেখক হিসেবে নিজস্ব জীবনাভিজ্ঞান, ব্যাপক পঠন-পাঠন ও ব্যক্তিজীবনের আদর্শবাদের চেতনা থেকে তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি গভীর মনোযোগিতায় সৃষ্টি করেছেন তাঁর উপন্যাসসমূহ। তাঁর উপন্যাসের শ্রেণিবিভাগ নিম্নরূপে উপস্থাপনযোগ্য :

(ক) রাজনীতি কর্মকালের (১৯৩৯-১৯৪৮) জনজীবনের অভিজ্ঞতা অর্থাৎ গান্ধি আন্দোলনের চিত্র হিসেবে “জাগরী’’ (১৯৪৫) ও “ঢোঁড়াইচরিতমানস’’ (প্রথম চরণ ১৯৪৯, দ্বিতীয় চরণ ১৯৫১) এবং জনজীবনের স্বাধীনতা আন্দোলনের পারিপার্শ্বিকতায় চিত্রিত “চিত্রগুপ্তের ফাইল’’ (১৯৪৯) এ তিনটি উপন্যাসকে এক পর্বের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, যেখানে জনজীবনের চিত্র আসল বিষয়। (খ) “সত্যি ভ্রমণ কাহিনী’’ (১৯৫১) রচনাকাল হিসেবে “চিত্রগুপ্তের ফাইলে’’র সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও এটি মেজাজে, বিষয়দৃষ্টিতে এক নতুন শ্রেণির বিষয়, প্লটে-ভাবনায় ও রীতিতে অনন্য। (গ) অন্তর্মুখিতার প্রাধান্যে রচিত হয়েছে “অচিনরাগিনী’’ (১৯৫৫), “সংকট’’ (১৯৫৭) এবং “দিগভ্রান্ত’’ (১৯৬৬)। “ঢোঁড়াইচরিতমানস’’, “চিত্রগুপ্তের ফাইল’’ ও “দিগভ্রান্ত’’ সর্বজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত। অন্যদিকে “জাগরী’’, “অচিন রাগিনী’’ ও “সংকট’’ উত্তম পুরুষে রচিত। এদের মধ্যে “সত্যি ভ্রমণ কাহিনী’’ ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাস। উল্লিখিত উপন্যাস রচনায় সতীনাথ ভাদুড়ীর যে জীবনদর্শন ও শিল্পবোধ সক্রিয় ছিলো তা এবার বিবেচনা করা যাক।

    বিশ্বব্যাপী দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধের সংকট ও ভারতবর্ষের স্বদেশীযুগ পরবর্তী ‘গান্ধীযুগের উদার অভ্যুদয়’ও পরবর্তী রাজনীতিক ‘পঙ্কাবর্তে’ সতীনাথ ভাদুড়ীর জন্ম, শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাস বলয়িত। সতীনাথ ভাদুড়ী বিহারের পূর্ণিয়ায় লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল পিতা ইন্দুভূষণ ভাদুড়ীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাদীক্ষায় সুপরিচিত ভাদুড়ী বংশের সন্তান হিসেবে শৈশবেই বাংলার প্রদেশরূপে পূর্ণিয়ায় (১৯১১) তিনি পেয়েছিলেন রামায়ণ-মহাভারতের স্নিগ্ধ ও আদর্শ জীবনদৃষ্টি। পূর্ণিয়ার পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্মান সতীনাথকে দিয়েছিল আর্থিক মুক্তি। ফলে তিনি সাংসারিক সংকট থেকে সহজেই নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন। অর্জন করেছিলেন উচ্চতর ডিগ্রি। কিন্তু স্বভাবে আত্মমুখি সতীনাথ ছিলেন নিঃসঙ্গ। মাতৃবিয়োগের (১৯২৮) পর তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলো হাতে গোনা দু’একজন। “অনুমান করা যায় তার বন্ধু ছিলো বই, সঙ্গী ছিলো তার পর্যবেক্ষণ শক্তি, তার মননশীলতা, ইনটেলেকচুয়াল সৃষ্টির সঙ্গে সরস জীবনদৃষ্টি এবং ‘সত্যি ভ্রমণ কাহিনী’র নায়কের মতো তাঁর ভাবপ্রবণ মনে একটা আদর্শবাদিতার মোহ জন্মেছিলো সেই ছোটোবেলাতেই। হয়তো তার প্রাবল্যে সতীনাথের তখন সংসার ধর্মে কোনো উৎসাহও ছিলো না।’’

    ১৯৩২-১৯৩৯ পর্যন্ত সতীনাথ পূর্ণিয়াতে ওকালতিতে কাটান। এ সময় ভারতবর্ষের লবণ সত্যাগ্রহের কাল (১৯৩০-১৯৩২)। কিন্তু সতীনাথ মদের দোকানে পিকেটিং করলেও তখনো তাঁর রাজনীতিতে ততো উৎসাহ দেখা যায়নি। তবে এ সময়ে তাঁর রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সাহিত্যচর্চার সংবাদ পাওয়া যায়। সেই সময় সতীনাথের মনের আর এক ঠিকানা পাওয়া যায় তা হলো “শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টি ও আত্মপরিহাস’’।

    ১৯৩৯ সালে সতীনাথ কংগ্রেসে যোগদান করেন। ‘সত্যপ্রিয়’, ‘বিদ্যাপ্রিয়’, ‘Sincere’  সতীনাথ ভারতের জন-আন্দোলনের মধ্যদিয়ে আত্মানুসন্ধান ও জনজীবনের সঙ্গে অন্বয় সাধন করতে চেয়েছিলেন। এজন্য জেলা কংগ্রেসের সেক্রেটারির কাজে, সংগঠনে, পরিচালনায় সতীনাথ কর্মব্যস্ত থেকেছেন।“কংগ্রেসও দেখতে দেখতে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের এগিয়ে গেলো। শুরু হলো ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের পর্ব।’’ প্রকাশ্য ও গোপন আন্দোলনের অক্লান্ত সংগঠক ও পরিচালক সতীনাথ গ্রেফতার হলেন (১৯৪০) ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের জন্যে। হাজারীবাগ কারাবাস এনে দিলো তাঁর ভিন্ন জীবন। জেলে বসে তিনি পড়লেন রামচরিতমানস, চর্চা করলেন উর্দু ও ফরাসি ভাষার। রাজনীতিকর্মী হিসেবে সতীনাথ ঘুরেছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, কখনো পায়ে হেঁটে কখনো বা গরুর গাড়িতে। ফলে তিনি “মানব সঙ্গমে জীবনসত্য ও মানব সত্যের নিগূঢ় রহস্য’’ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘‘জাগরী’’, ‘‘ঢোঁড়াইচরিতমানস’’ই কেবল নয় তাঁর অন্যান্য গল্প-উপন্যাসে জীবনের এ অভিজ্ঞতার চিহ্ন বর্তমান। ১৯৪০-১৯৪৭-এর মধ্যে সতীনাথ তিনবার (১৯৪০, ১৯৪১, ১৯৪৪) কারাবরণ করেন। দ্বিতীয়বারের কারাবাসে তিনি রচনা করেন ‘‘জাগরী’’ (১৯৪৫)। ১৯৪৪ সালে জেলে থাকার সময় তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। পরবর্তী সময় মুক্তি পেয়ে সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পরে তিনি কংগ্রেস সদস্যপদ ত্যাগ করেন। এরপর তিনি স্বল্পদিনের জন্য কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন (১৯৪৮)।

    কংগ্রেস আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে সতীনাথ ভাদুড়ী ব্যক্তি জীবনে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন তারই আলোকে রচনা করেন- “জাগরী’’, “ঢোঁড়াইচরিতমানস’’ এবং স্বল্পস্থায়ী সোস্যালিস্ট পার্টিজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখেন “চিত্রগুপ্তের ফাইল’’। রাজনীতি-উত্তর চিত্র “সংকট’’। আত্মীকৃত অভিজ্ঞতাকে এ পর্বে তিনি শিল্পনিয়মে রূপায়িত করেছেন। ১৯৫০ সালে সতীনাথ ইউরোপ ভ্রমণে বের হন। ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর “গভীর ও নিবিড় পরিচয়’’ ছিলো পূর্বেই। ফলে তাঁর শিল্পদৃষ্টি ও মানস জীবন গঠনে অভিজ্ঞতা ছিলো অনিবার্য। দুই বছর ইউরোপ ভ্রমণে তিনি সংগ্রহ করেছেন সে সব দেশের অভ্যন্তর, তার মাটি জল আকাশ ও তার মধ্যে উদ্ভূত পালিত পুষ্ট দেশের সাধারণ মানুষের স্বরূপ। ফলে তিনি “তাঁর পরিদৃষ্ট ইউরোপ, সে মহাভূমির রূপ ও সংস্কৃতির মধ্যে যে আপাতবিরোধী জটিল রমণীয়তা তা ‘সত্যি ভ্রমণ কাহিনী’র মধ্যে সুদক্ষ শিল্পীর সরস ও সব্যঙ্গ দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন।’’ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর অকৃতদার, বাগানপ্রিয় নিঃসঙ্গ সতীনাথ পূর্ণিয়াতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। এর মধ্যে ‘দিগভ্রান্ত’ উপন্যাসের উপকরণ ও বস্তুসত্য সংগ্রহ করার জন্য বৃন্দাবন গিয়েছিলেন (১৯৫৫)। তাঁর এই বৃন্দাবন যাত্রা স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁর সত্যনিষ্ঠতা। “ভেতর থেকে সংযুক্ত (Connected)  না হলে যেমন জনজীবনের মর্মবস্তুকে আয়ত্ত করা যায় না তেমনি ধর্মজীবনের বস্তুতেও প্রবেশ না করলে তা শিল্পায়িত হয় না। এই সত্যনিষ্ঠা সতীনাথের শিল্পনীতি।’’

    আত্মমুখী সতীনাথ বৈজ্ঞানিক নিরাসক্তিতে তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। আত্মমুখী অন্বেষণ ছিলো ঈষৎ বিষাদ মিশ্রিত হাসির সংযোগে অপূর্ব। আর সেই আত্মমুখী অন্বেষণে ‘‘জাগরী’’তে দেখা যায় তাঁর শান্ত বিনয়ী হাস্যরেখা। ঢোঁড়াইতে সেই প্রত্যয়সিদ্ধ রঙ্গরসের হাসি। সতীনাথ ভ্রমণান্তে দৃষ্টি সংহত করে লেখেন–To cultivate his garden. “অচিন রাগিনী’’তে সেই সূক্ষ্ম সংহত দৃষ্টির হাসিতে দেশ ও কালে যে বিশ্ব সংকটের ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতার (Revolution betrayed) দুঃসহ মিথ্যাচার এসেছিলো তা সুচিহ্নিত। মূলত সতীনাথের জন্মগত আত্মমুখি মন বিশ্বাসজীর মতোই সংকটের পর সংকট পেরিয়ে আত্মানুসন্ধানের শেষ দেখতে পায়নি, আত্মানুসন্ধান ত্যাগও করেনি। অন্তহীন, অর্থহীন, নিঃসঙ্গতা ও চরম বিভ্রান্তির মধ্যে “সতীনাথের সত্তার সাধনা শুধু শিল্পের সিদ্ধি নয়, এক ‘জারজ’ কালের জিজ্ঞাসায় অপ্রতিহত সন্ধান।’’

২.

আধুনিক উপন্যাস যুগের বাস্তব চিত্র। যুগ ও যুগমন ও যুগযাতনাকে অঙ্কনই আধুনিক উপন্যাসের মৌল বৈশিষ্ট্য। জেমস জয়েস-এর ইউলিসিস (১৯২৫)-এর পর ভার্জিনিয়া উলফ, ডিএইচ লরেন্স, টমাস মান, কাফকা, প্রুস্ত, কামু, সার্ত, ফ্লবেয়ার, ফকনার, তলস্টয়, দস্তোয়ভস্কি, তুর্গেনিভ, গোর্কি প্রভৃতি সাহিত্যিকের উপন্যাসে অভিজ্ঞতানুযায়ী যে জীবনের অন্তরময় চিত্রকল্প রূপায়িত হয়েছে তা সতীনাথ ভাদুড়ীর, যিনি ছিলেন অক্লান্ত পাঠক; তাঁর উপন্যাস সৃষ্টিতে বহুলাংশে কার্যকরী হয়েছিলো। অনুভূতি-আশ্রয়ী স্মৃতি, ভাবানুষঙ্গে এক একটি ঘটনাকে জীইয়ে তুলে অতীতের পুনরুদ্ধার করার প্রচেষ্টা তাঁর উপন্যাসে রেখায়িত হয়েছে। তাঁর উপন্যাসে যুগযন্ত্রণায় চিহ্নিত মানুষের যে আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মবিচার শিল্পরূপ পেয়েছে, তা সমসাময়িককালের ঔপন্যাসিকের থেকে স্বতন্ত্র। “একইকালে, একই দেশে জন্মালে বিষয়ে, অভিজ্ঞতায় ও সাহিত্য চেতনায় এক-আধটু সহধর্মিতা থাকার কথা, কতোকটা অনুসরণীয়। কিন্তু সমসাময়িক বাঙালি সাহিত্যিকদের সঙ্গে সতীনাথের জীবনভাবনায় বা শিল্পকর্মে কিছু যোগ ছিলো কিনা তা সন্দেহ। অবশ্য লেখকেরা নিজের স্বকীয়তায় প্রত্যেকেই বিশিষ্ট। কথা এই সতীনাথ আপন সাহিত্য সৃষ্টিতে শুধু অনন্য নয় এককও। সাহিত্য ও উপন্যাসের এই পটভূমিতে উপন্যাসের ক্ষেত্রে সতীনাথ স্বয়ংসম্পূর্ণ।’’

    দেশীয় উত্তরাধিকার এবং বিদেশী প্রেরণা সবকিছুকে নিজের নিরাসক্ত শিল্পদৃষ্টিতে স্বাঙ্গীকৃত করে সতীনাথ ভাদুড়ী তাঁর উপন্যাসগুলো রচনা করেছেন। তিনি পঠন-পাঠন ও ব্যক্তি জীবনের আদর্শবাদ অর্থাৎ সত্য ও ন্যায়ের পথের পথিকরূপে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি গভীর মনোযোগিতায় সৃষ্টি করেছেন তাঁর ‘‘জাগরী’’।নিরাসক্ত শিল্পদৃষ্টিতে তিনি যুগ-যন্ত্রণায় চিহ্নিত মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মবিচার, বিষাদ বা হতাশাকে বাণীবদ্ধ করেছেন। “তাঁর চরিত্রগুলোর আত্মানুসন্ধানের মধ্যদিয়ে যেমন তেমনি শিল্পসঙ্গতির সঙ্গে আভাসিত হয়েছে লেখকের আত্মানুসন্ধানও।’’ সতীনাথ ভাদুড়ী বিশ্বাস করতেন- “বর্তমানকালে সাহিত্যের উপন্যাস বিভাগটিই সবচেয়ে বেশি লোকের কাছে পৌঁছায়।’’ কিন্তু বর্তমানকালে সাহিত্যের সফলতা নির্ভর করে- (ক) Tell of exciting events এবং (খ) Provide the reader with an imagined with frustration.  এজন্যে তিনি বিপরীত স্রোতে অবগাহন করেন। তাঁর উপন্যাসে সৃষ্টি হয় রূপবৈচিত্র্য।   

‘‘জাগরী’’ উত্তম পুরুষে রচিত। এই উপন্যাসের কাহিনি পাষাণকারার বদ্ধ দুয়ার থেকে রাজনৈতিক তরঙ্গ-বিক্ষোভের সমকালীন ইতিহাসে ছুটে গেছে। এখানে জেল-প্রতিবেশ কাহিনির স্থায়ী অংশ। কিন্তু নিছক কারাজগতের তথ্য তুলে ধরার জন্য সতীনাথ এটি রচনা করেননি। একটি যুগের রাজনৈতিক চরিত্রগুলিকে জেল প্রাচীরের লৌহনিগড়ে অবরুদ্ধ করে তাদের চিন্তাজগতের অর্গলমুক্তি ঘটিয়েছেন। ‘চরিত্রগুলিকে স্থিরচিত্রের মতো বিলুর ফাঁসির আগের মুহূর্তে পূর্ণিয়া সেন্ট্রাল জেলে প্রতিষ্ঠিত না করলে ‘জাগরী’একটি আধুনিক চেতনাপ্রবাহী উপন্যাসে পরিণত হত না।’লেখকের নিজের রাজনৈতিক জীবন ও কারাজীবনের অভিজ্ঞতা উপন্যাসে পুঙ্খানুপুঙ্খতার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। ১৯৪২-এর আগস্টের ঘটনাসমূহের যে বর্ণনা নীলু-চরিত্রের মাধ্যমে বিধৃত, তা সতীনাথেরই ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা। পূর্ণিয়া জেলার গ্রাম ও শহরের মানুষের দাবি-আন্দোলনের জোয়ারে ভাসা উন্মত্ত বিশৃঙ্খলা, প্রাণদানে আগ্রহী মানুষের ছবি এ উপন্যাসে নিখুঁতভাবে এসেছে। তার সঙ্গে এসেছে ভাগলপুর সেন্ট্রাল জেলের বন্দিদের ছবি।

‘‘জাগরী’’র কথাবস্তু পরিকল্পিত হয়েছে আধুনিক যুগের দৃষ্টিতে। আগেই বলা হয়েছে যে, অনুভূতিআশ্রয়ী স্মৃতি, ভাবানুষঙ্গে এক একটি ঘটনাকে জীইয়ে তুলে অতীতকে পুনরুদ্ধার করার প্রচেষ্টা সতীনাথ ভাদুড়ীর এ উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য দিক। উপন্যাসটি কারাজগতের সামগ্রিক, তথ্যসমৃদ্ধ ও মননশীল চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। একই পরিবারের ফাঁসির সেলের বিলু, আপার ডিভিসন ওয়ার্ডে তার গান্ধিবাদী বাবা, আওরাৎ কিতার মা এবং জেলগেটের ছোট ভাই নীলু- এ চারজনের চিন্তা ও স্মৃতির যৌথায়নে কারাজগতের বাস্তবতা রূপায়িত হয়েছে এখানে। কারাপ্রেষণযন্ত্রের আড়ালে নানা শ্রেণির জেলকর্মীর বর্বরতা ও দুর্নীতির চেহারাও উদ্ঘাটিত হয়েছে লেখকের কুশলী বিন্যাসে। উপন্যাসটির চার পর্বের প্রথমেই রয়েছে কারাগার চিত্র- ‘চারিদিকে দেওয়াল। যে দিকে তাকাও দৃষ্টি দেওয়ালে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসে, কিন্তু সর্বদা উৎকর্ণ হইয়া থাকি, যদি বাহির হইতে কিছু শোনা যায়।’অবশ্য উপন্যাসটিতে আনুপূর্বিক আখ্যায়িকা নেই। তবে চারটি চরিত্রের মনোজগতের বর্ণনায় ঘটনার কার্যকারণ সূত্র আছে।

বাবা সরকারি স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক, পরিচিত গান্ধিবাদী মাস্টার সাহেব হিসেবে। মা গান্ধিবাদ না বুঝলেও স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তিবশত তাঁর আদর্শের অনুসারী। এজন্য আপন দুই সন্তানের মা নন তিনি, সারা জেলার কংগ্রেসকর্মীদের মা। বড় ছেলে বিলু কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির সদস্য। আগস্ট-আন্দোলনের সময় ধ্বংসাত্মক কাজে নাশকতার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে। ছোট ভাইয়ের সাক্ষ্যে সামরিক ট্রাইবুন্যালের বিচারে তার ফাঁসির হুকুম হয়েছে। ভোরে ফাঁসির প্রতীক্ষায় আছে সে। তারই ছোট ভাই নীলু এখন কমিউনিস্ট পার্টিতে। সাম্যবাদী দলের আদর্শে ও কর্মধারায় বিশ্বাসের জন্য ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জার্মানির বিরুদ্ধে ইংরেজশাসিত লড়াইকে ‘জনযুদ্ধ’বলে মানে ও ভারতের ইংরেজ সরকারকে সর্বপ্রকার সাহায্য করে, মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য জনতা পঞ্চায়েতের কর্ণধার হয়েছে সে। রাজনৈতিক বিশ্বাস অনুযায়ী বড় ভাই বিলুর বিচারের সময় তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে সে। এই চার চরিত্রের মনের জটিল অন্তর্লোকের উন্মোচনে ‘জাগরী’বিশিষ্ট। উপন্যাসে মনোজগতের বিবরণে বিস্মৃতির গর্ভ থেকে উঠে এসেছে ছোট ছোট ঘটনা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একসঙ্গে মিলে গেছে। অন্তরঙ্গ, মধুর পারিবারিক স্নেহ-সম্পর্কের অনিবারিত প্রকাশ ঘটেছে নানা দিক থেকে। মূলত ‘‘জাগরী’’র কাহিনির অন্তর্বুনন এবং পরিবেশের বাস্তবতায় পাঠক মুগ্ধ। কারা-উপন্যাসের মহত্তম দৃষ্টান্ত এটি।

তবে ‘‘জাগরী’’ সম্পর্কে কারা-উপন্যাস অভিধা সবসময় যথার্থ নয়। যদিও এই উপন্যাসের স্থান-কাল, দেশ-প্রতিবেশের সংযোগবিন্দু, প্রত্যক্ষতর কারাগার, যাকে কখনও রেলস্টেশনের মতো, কখনও শহরের মতো মনে হয়। উপন্যাসের সব প্রধান চরিত্রই এক অর্থে চরিত্রগত বিকাশের পরিণত স্তরেই কাহিনিতে এসেছে। ১৯৪২-এর বিস্ফোরক সময় কারাগারের পরিসরে, স্পেসে তাদের নতুনভাবে আবিষ্কার করে। কারাগারের বেষ্টিত পরিসরে আপার ডিভিসন ওয়ার্ড, আওরৎকিতা ও ফাঁসি সেলের পরস্পর বিচ্ছিন্ন স্পেসে এই চরিত্রগুলি আত্ম-ভাবনায় নিমগ্ন। স্পেসের এই বিচ্ছিন্নতায় তারা ঐক্যবদ্ধ সময়ে, ৪২-এর আন্দোলনে। আন্দোলনের ইতিহাসের সময়মাত্রা চরিত্রগুলোর ভিন্ন স্পেসকে একসূত্রে এনেছে। পরিবারের একজনের ফাঁসির সামনে দাঁড়িয়ে, জেলখানার একদিক থেকে বদ্ধ, নিয়মতান্ত্রিক স্পেসে চরিত্রগুলি সময়ের মধ্যে বাঁচছে। স্মৃতির স্রোতে তারা ঐ স্পেসের বদ্ধতাতেই সাড়া দিচ্ছে সময়ের ডাকে।

অর্থাৎ ‘‘জাগরী’’তে এমন একটি কাহিনির ধারা প্রবাহিত যার মূল চরিত্রগুলো দাগী কয়েদী কিংবা কোনো যাবজ্জীবন দণ্ড প্রাপ্ত আসামির আত্মস্মৃতির চর্বিতচর্বণ নয়। এর জেল-প্রতিবেশ অবশ্যই কাহিনির স্থায়ী অংশ। কিন্তু যে তিনটি চরিত্র জেলজগতের অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে এঁরা সকলেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের কক্ষচ্যুত অংশ। তাছাড়া ‘‘জাগরী’’তে সচেতনভাবে জেলজগৎ রয়েছে উপন্যাসের মূল স্রোতকে পরিপুষ্ট করার জন্য। যেমন জেলে পুরুষ ও নারী বিভাগে কয়েদীদের আলাপ আলোচনার বৈপরীত্য। নারী কয়েদীদের আলোচ্য বিষয় ব্যক্তি নিন্দা ও ব্যক্তি স্বার্থের আত্মকেন্দ্রিক গল্প। তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব মনোমালিন্য অত্যন্ত প্রকট। অন্যদিকে পুরুষ কয়েদীদের আলোচ্য বিষয় রাজনীতি ও ধর্ম। নারী কয়েদী যেখানে পারিবারিক জীবনের কুম্ভপাকে ঘূর্ণায়মান, পরনিন্দা ও পরচর্চা যাদের অজ্ঞতাকে নগ্নভাবে দেখিয়েছে সেখানে পুরুষ চরিত্র সমাজনীতির নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিব্যাপ্ত। যেমন, বিলু উদার ও দার্শনিক নিরাসক্তির প্রতীক, তেমনি বাবা মানবধর্মের চিরন্তন বিশ্বাসে আস্থাশীল। নীলু আপাত অসহিষ্ণু একরোখা হলেও দাদার প্রতি প্রেম ও ভালোবাসায় সে যেন আত্মঘাতী সমালোচক। মায়ের মনোবিকারের অবশ্যই একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে, যা বাদ দিলে চরিত্রটিকে অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু বিলুর আসন্ন ফাঁসি মায়ের আপাত মানসিক অসামঞ্জস্যের বিপদ প্রতিহত করে। বস্তুত সতীনাথ ভাদুড়ী নিছক কারাজগতের তথ্য তুলে ধরার জন্য ‘জাগরী’রচনা করেননি। একটি যুগের রাজনৈতিক চরিত্রগুলিকে যদি জেল প্রাচীরের লৌহনিগড়ে অবরুদ্ধ করা না যায় তাহলে তাদের চিন্তা স্রোতের অর্গলমুক্তি ঘটে না। চরিত্রগুলিকে স্থিরচিত্রের মতো বিলুর ফাঁসির আগের মুহূর্তে পূর্ণিয়া সেন্ট্রাল জেলে প্রতিষ্ঠিত না করলে ‘জাগরী’একটি আধুনিক চেতনাপ্রবাহী উপন্যাসে পরিণত হত না। সুতরাং উপন্যাসের আঙ্গিক কৌশল এবং শিল্পরীতির স্বার্থে কারাজগৎ একটি জরুরি অনুষঙ্গ- এর অতিরিক্ত কোনো মূল্য থাকতে পারে না। ‘জাগরী’র কাহিনি পাষাণকারার বদ্ধ আবেষ্টনী থেকে রাজনৈতিক তরঙ্গ-বিক্ষোভের সমকালীন ইতিহাসে ছুটে এসেছে।

৩.

‘‘জাগরী’’র পটভূমি ১৯৪২ সালের গণ-আন্দোলন। কিন্তু কথাকেন্দ্র বাবা, মা, বিলু ও নীলুকেন্দ্রিক একটি পরিবার। পারিবারিক বন্ধনের উপর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আঘাত সৃষ্টি করে একটি পরিবারের কর্মাদর্শ ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে বহুমুখী সংঘাতের সৃষ্টি করেছে। উপন্যাসের প্রধান কুশীলবরা সবাই জেগে আছে রাত্রির অবসানের জন্য, যে অবসান একদিন সংহত, একদিন পরস্পর লগ্ন পরিবারের একজনের ফাঁসিকে নিয়ে আসবে, আর যার সাক্ষ্যে সেই ফাঁসি সেও অপেক্ষা করছে তার দাদার মরদেহটার জন্য। এ প্রতীক্ষার মধ্যে মধ্যবিত্তের রাজনীতির কাটাকুটি- পারিবারিক অভিজ্ঞানের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, ব্যক্তিক সম্পর্ক রাজনৈতিক সম্পর্কে কেমন বদলে যায় তার ইতিহাস। মূলত প্রধান চারটি চরিত্রে মানসিক অবস্থানের সঙ্গে লেখক সুকৌশলে মিলিয়েছেন তাদের বাস্তবগ্রাহ্য চরিত্রপট। নীলু উগ্র এবং গোঁয়ার, বিলু নীতি ও শৃঙ্খলায় স্থিতধী, বাবা গান্ধিবাদী আদর্শে নিষ্ঠ, মা মাতৃস্নেহে বিহ্বল বাঙালি নারী। চারিটি চরিত্রের অল্পবিস্তর জোয়ার ভাটা একটি পরিপূর্ণ কাহিনি গড়ে তুলেছে।

বিলু : ফাঁসির সেলে বন্দি বিলুর আত্মকথন দিয়ে ‘জাগরী’ উপন্যাসের পট উন্মোচিত হয়েছে। এই চরিত্রের অন্তর্মুখীনতা এবং তন্ময়তা রাজনৈতিক নায়কের বিরুদ্ধে হলেও গণ-আন্দোলনের ধাক্কায় সে পাল্টে যায়। ফাঁসির আসামির শেষ ইচ্ছা কি, বিলু জানায়নি। আত্মকরুণার কোনো প্রশ্রয়ই সে দিতে নারাজ। তার স্মৃতিতে পর্যায়ক্রমে ভেসে ওঠে নীলুর স্মৃতি, তার দুষ্টামি। আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ। পাটনা ক্যাম্প জেলে মিলিটারির আঘাত থেকে বিলুকে বাঁচিয়েছিল নীলু সেই স্মৃতিও তাকে কাতর করে তোলে। দেশসেবকদের অন্তহীন বিসর্পিল লাইনে নিজের স্থান করে নিয়েছিল বিলু। তার স্মৃতিতে বাল্য-কৈশোর, মা-জ্যাঠাইমা, নীলু ও আরও কিছু আসে। গাছের চিত্রকল্প সে দেখে, প্রকৃতি প্রেমিক, কবিমনা, নিজ মত প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহী এই যুবক প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত গহনস্তরে সে অন্যমানুষ। আদর্শবাদী বিলু রাজনীতির স্রোতে ভাসমান হলো এবং ‘সময়’তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ভালো ছেলে হয়ে থাকায় আদর্শবাদে সে তার সত্তাকে নিজের মতো উন্মোচন না করে, বাবার আদর্শে গড়া রাষ্ট্রীয় পরিবারের একজন করে তোলে- তবে ঐ করে তোলার পিছনে থাকে ‘সময়’- ১৯২০-৩০, ১৯৩২-৪০-এর সময়। ‘‘জাগরী’’ উপন্যাসের প্রধান কুশীলব ঐ সময়। সময়ের সংযোগ বিন্দুতে নানা মানুষ নানাভাবে সাড়া দেয়। আর এখানে বিলুও উপন্যাসটির রাজনৈতিক মাত্রা। বিলুর মতো মানুষও রাজনীতির সামনে, বিরাট জনপ্রবাহের ব্যারিকেডের অভ্যুত্থানের পুরোযায়ী ব্যক্তি হয়ে উঠেছে ঐ রাজনীতি স্পৃষ্ট সময়ে। সতীনাথ দেখান ঐ সময়ে রাজনীতি কেমন রাজনৈতিক সত্তার নয়, এমন মানুষকেও রাজনৈতিক করে তুলছে, রাজনৈতিক স্বপ্নে আন্দোলিত করছে। জনসমাজে রাজনীতির ধাক্কা কিভাবে ব্যক্তির চরিত্রের বিকাশ, আবার বিকশিত না হওয়াকে নিয়ে আসছে। বিলু এই অর্থেই গভীর অর্থে রাজনৈতিক চরিত্র এবং জটিলও। 

বাবা : বাবা চরিত্রটি আপাত দৃষ্টিতে নির্দ্বন্দ্ব। জাতীয় পতাকাকে নমস্কার জানিয়ে তাঁর কথা শুরু। এই পিতার পুত্র বিলুর জন্য যন্ত্রণা তীব্র। যদিও ছেলেরা কোনোদিনই তাঁর সঙ্গে নেহাত কাজের কথা ছাড়া কথা বলে না। বিলু তাঁর বাবার সামনে সংকুচিত হয়ে যায়। তবে নীলুর মধ্যে বিলুর মতো স্বভাব নেই। বিলু-নীলুর ব্যবধানের জন্য বাবা নিজেকেই দায়ী করেছেন। তিনি ভেবেছেন ছেলেদের সঙ্গে বন্ধু ভাব করলে তাদের শাসন করা শক্ত। তবে তিনি পারিবারিক ও রাজনৈতিক সব সম্পর্কের ক্ষেত্রেই শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক দেখেন। তাই দু’পুত্রের ব্যবধানের কারণ খোঁজেন শিক্ষার মধ্যে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গান্ধিজির আত্মশুদ্ধি- কৃচ্ছ্রসাধন, মৌনব্রত প্রভৃতি।

    বাবা ১৯২১-২২ সালের মানুষ, ‘১৯২১-২২-এ যখন জেলে আসি তখনকার জেল আর এখনকার জেলে আকাশ পাতাল তফাৎ। সেবার ছিলাম সাধারণ কয়েদীর শ্রেণিতে। … তাহার সহিত আজকের অবস্থার তুলনা হয়? চলা ফেরা, খাওয়া দাওয়া, থাকা সম্বন্ধে প্রত্যেকটি সামান্য অধিকার পাইবার পিছনে আছে কত ত্যাগ, কত বিস্মৃত শহীদদের আত্ম-বিলোপন। কিন্তু আশ্চর্য ইহাদের বিচার। আমাকে দিল আপার ডিভিসন, আমার স্ত্রীকে দিল আপার ডিভিসন, আমার ছেলে বিলুকে ডিভিসন থ্রি…’ ঐ বিভাজনে ১৯২১-২২ ও ১৯৪২ আলাদা হয়ে যায়। জেলের মধ্যে বাবা গান্ধির একান্ত অনুগত হয়েও মাহাত্মাজির দলে নিজেকে ভাবছেন না। আসলে বাবা কারুর সঙ্গেই একাত্ম হতে পারেননি। মহাত্মাজির দলের সামগ্রিক ছবিও এই আদর্শবাদী ১৯২১-২২-এর শিক্ষকের কাছে গ্রহণীয় নয়। ঐ চরকা-প্রাণ, চরকাই রামরাজ্য ফিরিয়ে আনবে, এই বিষয়ে স্থির বাবা সবকিছু মানতে পারেন না। সরকারি স্কুলের হেডমাস্টারি ছেড়ে তিনি যখন রাজনীতিতে আসেন তখন কারুর কথাই শোনেননি। তাহলে বিলুই বা তাঁর মত নিয়ে চলবে কেন- এ প্রশ্ন তাঁর নিজের কাছেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও নীলু-বিলুর পথকে তিনি মানতে পারেন না। ১৯৩০-৩২-এ তাদের কত চরকা কাটা, কত কথা। যেভাবে তারা গড়ে উঠেছিল, তাতে বাবা ভাবতে পারেননি, ওই উচ্চ আদর্শ তারা ছাড়তে পারেন। কিন্তু তাইতো হলো।

    জেলে বন্দি বাবার স্মৃতিতে বিলু-নীলু আসে। বিলুর কালো চোখের দৃষ্টি ভাবুকতায় ভরা। চোখের দিকে তাকালেই সে চোখ নামিয়ে নেয়। জোর করে তাকে দিয়ে কিছু করানো যায় না। বেহমুদ মোক্তারের বাগানে কুল খেতে গিয়ে ধরা পড়ে বিলু-নীলু। তাদের কুলের পাতার ওপর থুতু ফেলে চাটতে বলে, নাহলে মারবে, মাস্টার সাহেবকে বলে দেবে। নীলু ভয়ে থুতু খায়- বিলু কিছুতেই রাজি হয়নি। বাবার স্মৃতিতে ওই সংশয়ী, নিজ অচরিতার্থতায় যন্ত্রণাদগ্ধ বিলুকে দেখা যায় না, দেখা যায় এক বজ্র কঠিন নিজ প্রত্যয়ে স্থির বিলুকে। এ আরেক স্বর- চরিত্রগুলোর এই বিভিন্ন স্বরে ‘জাগরী’র চরিত্ররা পৃথক পৃথক উপাদানে জেগে ওঠে। কংগ্রেস সোস্যালিস্টদের সম্পর্কে তির্যক মন্তব্য বাবা একাধিকবার করেছেন। বিয়াল্লিশের আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির দূরে থাকা যে মার্ক্সিস্টদের দূরে থাকা নয়, বাবার আত্মকথনে তা স্পষ্ট। মার্কসবাদ ও কমিউনিস্ট পার্টির অভেদ এখানে নেই। বারবার ফাঁসির আসামি বিলুর কথা মনে হয় বাবার। ‘বিলুর যদি ফাঁসির সাজা না হইত, তাহা হইলে তো এতক্ষণ, এইরূপ একটা পর্দা ঘেরা ঘরের মধ্যে বসিয়া, দলের লোকদের ‘ক্যাপিটাল’পড়াইত। বিলু এখানে থাকিলে, আর কমরেড লছমী চতুর্বেদীকে এই গুরুগিরি করিতে হইত না।’আবার তাঁর প্রচ্ছন্ন গর্ব রয়েছে বিলুকে নিয়ে। বাবার ভাবনা- ‘বিলুর দুবেলাই ভাত খাওয়ার অভ্যাস- এখানে কি তা পায়। দুটি দুই হস্ত পরিধি রুটি জেলকোডে দুবেলা ভাত ‘বেঙ্গল ডায়েট’- অর্ধসিদ্ধ, দুষ্পাচ্য রুচি। এ খাওয়া ‘সাধারণ বাঙালির পক্ষে অসম্ভব। বাবার ইচ্ছা হয়, বিলু জানুক, তারই কথা মনে করে, এবার জেলে তিনি ফলমূল দুধ খান না, মশারি ফেলে শোন না। হয়তো বিলু এ খবর জানিলে তাহার মনে একটু তৃপ্তি হইত।’

    বাবা যে আদর্শ, যে আত্মত্যাগ, যে প্রত্যাখ্যানের স্বপ্নে রাজনৈতিক বৃত্তে এসেছিলেন, তার অধঃপতনই তিনি দেখেন- সোস্যালিস্টদের মধ্যেই শুধু নয়, তার দলেও। সোস্যালিস্ট, ফরওয়ার্ড ব্লক, কম্যুনিস্ট, কিষাণসভার ছেলেদের পড়ার উৎসাহ দেখেন তিনি আর অবাক হয়ে তাদের পন্থার কর্মীদের তুলনা করেন। তার চোখে রাজনীতির গান্ধিবাদী বাস্তবটা যে ধরা পড়ে না, তা নয়। বাবা দেখেন কংগ্রেস সোস্যালিস্ট দলের একজনের ফাঁসি, কিন্তু তাদের কার্যকলাপে কোনো বৈলক্ষণ্য নেই। অন্যদেরও তাই। আবার দেখেন, সকলেই তো জেগে আছে। অন্তহীন জাগর-এর রাত। মনের স্রোত বয়ে চলে- ‘বোধহয় আমার ছেলেদের যতটা গভীরভাবে ভালোবাসা উচিত, ততটা গভীরভাবে স্নেহ করি না।’ নীলু কলেজে পড়ে দাদা বিলুর টাকায়। রিলিফের কাজের হিসাবরক্ষক হিসেবে বিলু যে মাসহারা পেত, তাই সে নীলুর পড়ায় খরচ করত। অথচ বাবা জানতেন লেখাপড়া ছাড়া আর যে কোনো ক্ষেত্রেই সে সর্বোচ্চ স্থানে উঠবে, আর বিলু শিক্ষকতার লাইন ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে পারত না। নীলুর দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবার মর্ম বোঝে না বাবা। নীলু ও বিলুর উভয় দলের লক্ষ্য তো এক- কার্যক্রমে হয়তো একটু পার্থক্য হয়ে গেছে। এর ফল এতদূর গড়াবে? গণমতের ওপর নির্ভর পার্টির তো কর্তব্য হওয়া উচিত জনতাকে অন্যদলের ভুল বোঝানো ও ভ্রান্তপথ থেকে সরিয়ে আনা। নীলুর নিশ্চয় আদেশ বুঝতে ভুল হয়েছে। এর জন্য সারাজীবন সে অনুতাপ করবে।

    বাবার ভাবনাতরঙ্গ থেকে উপন্যাসে চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। বাবা ও বিলু উভয়ের দর্পণে নীলু বলিষ্ঠ, ঋজু, নিজ মত ও বিশ্বাসে স্থির, অপরের মনে আঘাত লাগল কিনা, নিজের মত প্রকাশের সময় সে সম্পর্কে আদৌ চিন্তিত নয়, ছোটোবেলায় মুরগী কাটতেও তার ভয় বা দ্বিধা হয়নি, কেবল সঙ্গীদের তাকে ছুঁয়ে থাকতে হত কাটবার সময়। একজন গান্ধিবাদী ও একজন সোস্যালিস্ট-এর চোখে একজন কমিউনিস্ট এরকম। বাবা বারবার তাঁর ব্যর্থতার কথা বলেছেন। নিজ পরিবারের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছিন্নতা, দূরত্বের কথা বলেছেন। এ দূরত্ব তৈরি করেছে অবশ্যই রাজনীতি আবার বাবার গান্ধিবাদী বয়োজ্যেষ্ঠতার বোধ। বিলুর এই পরিণতির জন্য, তিনি নিজেকে দায়ী করেছেন। আর তাঁর চোখেই গান্ধিবাদী কংগ্রেস- সোস্যালিস্ট কংগ্রেস ও নীলুর দলের নানা সমালোচনা। বাবা সব দলেরই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিজের মতো সচেতন, বিশ্লেষক। বাবার ধারণা নীলু পার্টিকে ভুল বুঝেছে। নীলুর রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দল থেকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। এই বিবেচনায় পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত স্তরই সামনে আসে। নীলুর কমিউনিস্ট হয়ে যাওয়ার উৎস তাঁর চরিত্রের মধ্যে খোঁজা হয়েছে।

    বাবা নিজের মধ্যেই পরিবারের ভাঙনের কারণ খুঁজেছেন। তাঁর রাজনৈতিক সত্তা পরিবারকে বাদ দিয়ে নয়- তাই সামগ্রিকভাবেই পরিবারকে তিনি আশ্রমের আবহাওয়ায় তাঁর নিজের মতো করে বড়ো করতে চেয়েছেন। গান্ধিবাদী রাজনীতির মধ্যে যে একটা কর্তৃত্বপরায়ণ দিক ছিল বাবার মধ্যে সেটাই লক্ষ্য করা যায়। বাবার আত্মকথনে রাজনীতি অনেক পুরোভাগে, তাঁর সঙ্গে পরিবারের দীর্ণতার জন্য হাহাকার। ১৯২০-২১ থেকে ১৯৪২-এর মধ্যেও রাজনীতি এই হাহাকারকে বহন করে। অনেক সংঘাত, পারিবারিক বন্ধনকে, সম্পর্ককে আঘাত করেছে। ওই বন্ধন পেরিয়ে তাই দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে নীলু।

মা : পারিবারিক বাস্তবতার কেন্দ্র বিলু-নীলুর মা। তাঁর আত্মকথার শুরু বিলু-সরস্বতীর বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে। মার সরস্বতীকে ভাল লাগে। নিজের ছেলের বৌ করতে চান। নিজের ছেলের- এই অধিকারবোধ এই গৌরবেই মা দাঁড়িয়ে। মার স্মৃতিতে বিলু উদ্ভাসিত নানাভাবে। বাবার মত মাও নিজেকে বিলুর জন্য দায়ী করেন, তাঁর মতই তিনি শাস্তি নিয়ে বিলুকে বাঁচাতে চান। তাঁর চেতনায় বিলুর কথা ঘুরে ফিরে আসে- বিলুর রামায়ণ-মহাভারত পড়ার কথা। মুখ ফিরিয়ে চোখের জল মুছত সে। নীলু চ্যাঁচাত দাদা কি করছে বলে। বিলুর এই ঠাকুর দেবতার ভক্তি হঠাৎ যেন বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উড়ে যায়। নীলুরও তাই। পৈতের ওপর তার নিষ্ঠা ছিল। সেই নিষ্ঠা একদিন তিরোহিত হলো। যে নীলু কাগজের ঠোঙায় পা লাগলে প্রণাম করত। ভুলে পঞ্জিকা ডিঙিয়ে গেলে তার পাপের কথা বলত- সেই নীলু একদিন মা সরস্বতীর ছবিটি নিচে রেখে তার ওপর রেখে দিয়েছিল বাড়ির সব জুতো। মার কাছে নীলুর এসব খামখেয়ালি কর্তব্য- ধর্তব্যের মধ্যে নয়, কিন্তু বিলুর কীর্তনে না যাওয়া, দেবে-দ্বিজে ভক্তি মন থেকে মুছে যাওয়ায় তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। যেদিন বিলুর বাবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল, সেদিন দারোগা সাহেব মাকে তাঁর নিজের বাড়িতে থাকার কোনো বাধা নেই জানিয়েছিল। তার তিন চারদিন পরে তাঁকেই থানায় নিয়ে আসে আটকবন্দি করে। সেখানে দারোগার স্ত্রী তাঁর জপ ও সন্ধ্যার ব্যবস্থা করে দেয়, দুটি সন্তান মারা যাওয়ার পর তৃতীয় সন্তানকে কোলে নিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। মা চেয়েছিলেন বিলু-নীলুকে একেবারে নিজের করে রাখতে। কিন্তু- ‘আমি তো ছেলেদের মুখের দিকে চেয়েই সব দুঃখ কষ্ট ভুলেছি। তাও ভগবান তোমার সইল না। ছেলে ভুলানো মন্তর দিয়ে সবাই আমার ছেলেকে পর করে দিল।’আশ্রমে মাছ-মাংস আসে না, গান্ধিজির কথা মতো বিশবছর মাছ-মাংস ছেড়েছেন, কিন্তু বিলু-নীলু মাছ খেতে ভালোবাসে- তাই দিদি (নীলুর জ্যাঠাইমা) তাদের মাছ খাওয়াতেন। মার মনে পড়ে নীলুর কথা। তিনি যেদিন শুনলেন তাঁর ছেলে বিলুর সাজা নীলুর সাক্ষীতে হয়েছে- সেদিন ঠকঠক করে কেঁপেছিলেন। মার কাছে একথা বলা বারণ ছিল। মা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। দাদা বিলু ছোটটো নীলুর গাল টিপে আদর করছে, সেই নীলু, দাদা অন্তপ্রাণ নীলু একাজ করবে। সে গোঁয়ার অবুঝ, খামখেয়ালি, তা বলে একাজ করবে? মায়ের স্মৃতিতে বিলু-নীলুর ছোটোবেলা, দুভায়ের একাত্মতা, নীলুর দাদার ওপর নির্ভরতার ছবি রয়েছে। ‘আজকাল বড়ো হওয়ার পর কতদিন দেখেছি- দুভাই ঘরে বসে গল্প করছে।’বিলু- নীলুকে আড়াল করছে।

    স্মৃতি-প্রবাহ মাকে বিলুর বাবার দিকে নিয়ে যায়। ওদের বাবা চিরকালই একটু গম্ভীর প্রকৃতির লোক। বাবাই মাকে চরকা, মহাত্মাজির দেশের কথা উঠলে হিন্দুস্থানীদের সামনে কী বলতে হয় শেখালেন হিন্দিতে ছড়া শিখিয়ে। ভেবেছিলেন মাও বক্তৃতা দিয়ে বেড়াবেন। কিন্তু মার দ্বারা এসব কিছু হয়নি। মা রামগড় কংগ্রেসের আগে বাবার কথায় স্বেচ্ছাসেবিকার ট্রেনিং নিতেও গেছেন। জেলে বসে মার ভাবনা- ‘সারাটা জীবন আমার একই রকম গেল। নিজে একদিন শান্তি পেলাম না। ছেলেদের একদিন হাসিখুশি ফুর্তিতে থাকতে দিতে পারলাম না। সারাজীবন ধরে যে উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে এসেছি, সে কি এরই জন্যে।’নিজের স্বামী সম্পর্কে তাঁর অভিমত- ‘তুমি দেশের স্বাধীনতার জন্য সব ছেড়েছ সত্যি- কিন্তু আমাকে তো একটুও স্বাধীনতা দাওনি।’গান্ধিজির বিরুদ্ধে মার তীব্র অভিযোগ- ‘গান্ধীজী, তুমি আমার এ কী করলে? তুমি আমাদের একেবারে পথের ভিখিরি করে ছেড়েছ, সত্যিকারের ভিখিরি। তোমার দেখানো রাস্তায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনের মিল হয় না, বাপ-ছেলেতে ভালোবাসার সম্পর্ক থাকে না, ভাই-ভায়ের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, গৃহবিচ্ছেদে সংসার ছারখার হয়ে যায়।’মার স্মৃতির বিভঙ্গে আত্মকথন ‘‘জাগরী’’কে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। মা আদ্যন্ত মা কিন্তু তিনি তাঁর এই মা-সত্তা নিয়েই ১৯২০-৪২-এর রাজনীতির আবর্তে বিবর্তিত। স্বামীর সিদ্ধান্তে ও ইচ্ছায় তিনি প্রচলিত মধ্যবিত্ত জীবন ছেড়ে চলে আসেন আশ্রমের জীবনে। আর ওই সিদ্ধান্তকে মেনে নেন। বাবা তাঁকে গান্ধিবাদী করে তুলতে চান। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিকতার নিয়ম অনুযায়ী খোঁজ রাখেন না স্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার। আর সেই ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্যও তাঁর কাছে থাকে না। মা কিন্তু তাঁর দৈনন্দিন যাপনে সেই অসাধারণ মানুষের মতোই রাজনীতির ফাঁকটা বুঝতে থাকেন। ছেলে ভুলানো এই রাজনীতি তাঁর সংসারে তাঁর ছেলেদের কি ভয়ানক সর্বনাশ করেছে, এটা যেমন তাঁর কাছে স্পষ্ট তেমনি তাঁর স্বামীর রাজনীতির একান্ত গুরুবাদী প্রবণতা, যুক্তিতর্ক বিসর্জন দিয়ে খামখেয়ালিপনা- স্বয়ং গান্ধির মধ্যেই এটা ছিল। মা এখানে সতীনাথ ভাদুড়ীর উপন্যাস-কাহিনির সচেতন বর্ণনাকারী।

নীলু : নীলুর আত্মকথন এভাবে শুরু হয়েছে- ‘জেলগেটের সম্মুখের গাড়ি বারান্দার নিচে, ওয়ার্ডার নেহাল সিং-এর সহিত আসিয়া দাঁড়াইলাম। গেটের বাহিরে সশস্ত্র প্রহরী। গেটের ভিতরটি উজ্জ্বল আলোকে আলোকিত।’ভোররাতে যার ফাঁসি হবে তার ছোট ভাই নীলু। এই নীলু গোঁয়ার, খামখেয়ালি, তার যা মনে হয় তাই করে ও বলে, অন্যে কি মনে করল এ বিষয়ে ভাবে না- বাবা-মা-বিলুর আত্মকথনে নীলু এভাবেই উপস্থাপিত। অর্থাৎ নীলুকে উপন্যাসে অন্যের কথনে যেভাবে পাওয়া যায়, তার নিজের কথনে সেভাবে নয়। দুবেজী, তাঁর স্ত্রী ও জ্যাঠাইমা বিলুর মোকাদ্দমা চালাবার জন্য টাকা দিতে চায়, দেয়। উকিল জ্যাঠাইমার টাকা পেয়েও, দুবেজীর দেওয়া টাকা নিতে ইতস্তত করেনি। দুবেজীর টাকা নীলু নিতে অস্বীকার করে- দুবেজী নিজেই উকিলের কাছে টাকা দেয়। দুবেজীর স্ত্রী যখন স্বামীকে লুকিয়ে তিনটে টাকা নীলুকে দিল তখন নীলুর ইচ্ছা হয়েছিল টাকা তিনটে মুখে ছুঁড়ে মারে। কিন্তু ‘তাহার পর হতাশাব্যঞ্জক মুখের দিকে তাকাইয়া মনে হইল যে, টাকাটা আমার লওয়া উচিত। বলিলাম, ‘আচ্ছা দাও টাকাটা।’এক সন্তানহীনা নারীর পরসন্তান বাৎসল্যের আবেগের কাছে আমার যুক্তি ও সিদ্ধান্ত মাথা নত করিল।’এরপরই সে প্রশ্ন করে, মোকদ্দমার সাক্ষ্য দেবার সময় নিজের রাজনৈতিক আদর্শ একটু নমনীয় করলে কী লোকসান হতো? রাজনীতির মতবাদের কথা ছেড়ে দিলেও ব্যক্তিগত জিদের প্রশ্ন ছিল। তার ওপর চাপ দিয়ে মত বদলাবার মত, নমনীয় রাজনীতির মত নীলু রাখে না। দুবেজীর স্ত্রীর ঘটনা ও বিলুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবার ঘটনা দেখায়, নীলু ব্যক্তিগত সম্পর্কে তার যুক্তি ও সিদ্ধান্ত পাল্টায় মানবিক আবেগে, কিন্তু বৃহত্তর ক্ষেত্রে ব্যক্তিক সম্পর্কের নিবিড় ঘনিষ্ঠতাকেও সে উপেক্ষা করে। নীলুর ভাবনা কথা বলে, দাদার মধ্যে সে চিরকাল লক্ষ্য করেছে ভাগ্যবাদিতার আমেজ। দাদার যুক্তি, যদি কোনো মূল সিদ্ধান্তে আঘাত না লাগে, তাহলে নিজের সৌজন্যকে বলি দেয় কেন সে? দাদার আত্মকেন্দ্রিক মন, সব প্রশ্ন সে নিজের ধরনে ভাবে, সব জিনিসের চুলচেরা বিচার করে- ‘যে কোনো সূক্ষ্ম বিষয় আমার অপেক্ষা ভালো বোঝে; কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত জীবনে, তাহার আচরণ যুক্তির সহিত সামঞ্জস্য রাখে না।’ নীলু রাজনীতিতে দাদার থেকে দূরে চলে গিয়েছিল। ১৯৩০ ও ৩২-এর আন্দোলনে অর্থাৎ গান্ধির নেতৃত্বে দ্বিতীয় সর্বভারতীয় আন্দোলনের সময়ই বিলু ও নীলু, দাদা আর ভাই তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যর্থতার কথা অনুভব করে। এ নিয়ে ক্যাম্পজেলে আলোচনা, বাদানুবাদ, মনোমালিন্য হয়ে যায়, যারা প্রকাশ্যে ব্যর্থতার কথা বলতো না, তাদের মুখেও হতাশার ছাপ ছিল স্পষ্ট। ১৯৪০-এ জেলে যাওয়ার সময় নীলু ও বিলু দুজনেই কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের সদস্য। নীলু রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতকে আলাদা করে দেখেছে। এজন্যই ৪২-এর আন্দোলনের সময় কমিউনিস্ট নীলু দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে। তার ধারণা, সে দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দিলেও, অন্য কেউ দিত। সরকারি লোকের অভাব নেই। তবে নীলু ভাবে জনমতকে তাচ্ছিল্য করা চলে, কিন্তু মার অব্যক্ত বেদনাভরা দৃষ্টিকে, জ্যাঠাইমার নীরব ভর্ৎসনাকে উপেক্ষা করা চলে না।

    নীলুর চরিত্র এক অর্থে ট্র্যাজিক। সে দাদার প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেয়েছে, নিজ অভিজ্ঞান ও সত্তাকে পেতে চেয়েছে, হয়তো এই চাওয়াই তাকে দাদার রাজনীতির বাইরে এনেছে, দাদাদের রাজনীতির সমালোচনা করেছে, আবার দাদা সম্পর্কে তার তীব্র ভালোবাসা, আবেগকে সে বহন করেছে। পার্টির লোকদের তার সাক্ষ্য দেওয়ার সমালোচনায় আঘাত পেলেও সে তার সিদ্ধান্তকে ভুল ভাবেনি, কিন্তু একটি সাদা খদ্দরের গেঞ্জির দাদা যেন প্রতীকী অর্থেই তার অস্তিত্ব জুড়ে। মা বিলুর থেকে আলাদা- সে রাজনৈতিক মতাদর্শে ও বাস্তবে বাঁচতে চায়, বিপরীত মেরুতে বাবাও। নীলুর বাঁচা এ সময়ে ১৯৪২-এর পটে, আরও যন্ত্রণার, বিচ্ছিন্নতার, কিন্তু সেই সঙ্গে মানবযাত্রার, মানুষের জীবনের রূপান্তরের স্বপ্নে উজ্জীবিত। রাষ্ট্র, শ্রেণি, দল- এসবের সচেতন বিশ্লেষণ সেই করেছে। আর এটা করতে গিয়েই সে রাষ্ট্রীয় পরিবারের একজন হয়েও বিচ্ছিন্ন। নীলু একইসঙ্গে বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণায় অনন্য আবার বৃহত্তর সেই মাটির মানুষের সঙ্গে সংযোগ-আকাঙ্ক্ষায় ভাস্বর। সতীনাথ নীলুকে বড়ো সমবেদনার সঙ্গে এঁকেছেন। শ্রেণিসচেতন মানুষের প্রতি ভালোবাসায় গভীর এক স্বাপ্নিকের কথাই বলেছেন। সেই সঙ্গে দাদার জন্য তীব্র যন্ত্রণার কথা। নীলু এ উপন্যাসে একটি সদর্থক চরিত্র। 

    বস্তুত ‘‘জাগরী’’ উপন্যাসের চরিত্রগুলি রাজনৈতিক সংঘাতে বিকশিত ও চলিষ্ণু। বাবার ভাববাদী আদর্শের সুতীব্র বলিষ্ঠতা, মায়ের অন্তর ধর্মের স্নেহ ও কল্যাণবোধ, বড় ভাই বিলুর অহিংস গণ-আন্দোলনের বিশ্বাসলোপ ও সোস্যালিস্ট তত্ত্বের নতুন বিশ্বাস, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অহিংস গণ-আন্দোলনের পথ গ্রহণ এবং নীলুর উগ্র কম্যুনিস্ট মতবাদ চরিত্রগুলির রাজনৈতিক দিক। কিন্তু নীলু ব্যতীত প্রতিটি চরিত্রই জেলজীবনের মধ্য থেকে অতীত জগতে ক্রম সঞ্চারিত। ‘‘জাগরী’’ একটি বিশিষ্ট রাজনৈতিক উপন্যাস। এর চরিত্রগুলি কাল্পনিক হলেও মূলত তারা লেখকের কারাভিজ্ঞতারই ফসল। রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে পারিবারিক স্নেহ-মমতার দ্বন্দ্ব গ্রন্থের ভূমিকেন্দ্র। প্রতিটি চরিত্রই নিজ নিজ আদর্শে কেবল বিশ্বাসী নয়, একনিষ্ঠ। অনেকটা মহাভারতের চরিত্রের মতো এখানে চরিত্রগুলি রাজনৈতিক ঘটনা ও পারিবারিক বন্ধনে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষত। বাবার জীবনমন্ত্র ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’। এই গানের মধ্য দিয়ে বাবার আত্মশক্তি এবং ভাবগত উচ্চতা প্রতিষ্ঠিত। তিনি যে শান্তি ও অহিংসার বাণী আত্মস্থ করেছেন তা নীলু ও বিলুর চৈতন্য জগতে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। বিলুর মা মাতৃস্নেহে, মমতায় বিলুর ফাঁসির আশঙ্কায় আর্তনাদ করে বলেছে- ‘গান্ধীজী তুমি আমার এ কী করলে?’ জেল গেটে শেষ রাতে দাঁড়িয়ে নীলু আত্মসংকট ও আত্মযন্ত্রণার তটে দাঁড়িয়ে মানবতার সমুদ্রগর্জন শুনেছে। উপরন্তু কংগ্রেস সংগঠনের সমাজতন্ত্রের অপূর্ণতা গান্ধিবাদী বাবার হিংসালোভশূন্য মানবিক আদর্শ, মায়ের শাশ্বত মাতৃত্ব (যা সমাজ বাস্তবতারই অন্য পিঠ), চন্দ্রিমার সরলতা, নোবে সিং-এর আন্তরিকতা ও নিয়মানুবর্তিতা, বিধায়ক মিশিরের মতো ধূর্ত ব্যবসায়ী এমন আরো অনেক ছোট ছোট চরিত্র আছে যা মূল ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে লেখকের কল্পনা ও পর্যবেক্ষণ শক্তিকে একটি গভীর অন্তর্লীন মানবতার প্রত্যন্তে পৌঁছে দিয়েছে। স্মৃতির ভাবানুষঙ্গে অনুভূতির এমন সার্থক সংযুক্তি বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ।

৪.

‘‘জাগরী’’ তার আঙ্গিক, রাজনৈতিক বক্তব্য, মনস্তাত্ত্বিক বর্ণনা, স্বাধীনতাযুদ্ধে উৎসর্গীকৃত প্রাণের আত্মদান- সকল বিষয়ে অভিনবত্বের দাবি করতে পারে। তবে ‘‘জাগরী’’ আনুপূর্বিক আখ্যায়িকা হিসেবে রচিত হয়নি। চরম সংকট মুহূর্তের প্রতীক্ষায় চারটি মানবমনে একই সময়ে কি কি ভাব, চিন্তা, স্মৃতির প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, তা উপন্যাসের বিষয়। এর আখ্যানের মুখ্য উদ্দেশ্য ঘটনার বিবৃতি নয়, মানবচরিত্রের বিশ্লেষণ। প্রত্যেকের মনে যে টুকরো টুকরো স্মৃতি ভেসে এসেছে, তা জোড়া দিয়ে পূর্বাপর কাহিনিটি পাঠককে গড়ে তুলতে হয়। এক হিসেবে আখ্যানের এই পদ্ধতির একটি বিশেষ উপযোগিতা আছে। এতে পাঠকের ঔৎসুক্য ও কল্পনাশক্তি সর্বদা জাগ্রত থাকে, প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি ব্যাপারের তাৎপর্য সহজে হৃদয়ঙ্গম হয়, বাইরের জগতের ঘটনাধারার সঙ্গে মানবমনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উপলব্ধি হয়। এজন্য লেখক আধুনিক সমাজের চারটি খাঁটি উন্নতমনা নরনারীর চিত্তে এক প্রলংকর সংঘাতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া ঘটছে তা মনোবিকলনের পদ্ধতিতে তাদের স্বগতোক্তির মাধ্যমে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। এক একটি অধ্যায়,- এক একটি গল্পাংশ মাত্র নয়- এক একটি মানবচরিত্রের পূর্ণ অভিব্যক্তি। যখন মৃত্যুর শীতল নিঃশ্বাস মজ্জার ভেতর পর্যন্ত একটা শিহরণ উৎপাদন করে, সে সময়ে মানুষের মস্তিষ্ক তীব্র গতিতে ক্রিয়া করতে থাকে; বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ সব যেন একসঙ্গে দেখা দেয়, বিস্মৃতির গর্ভ থেকে কত ছোটখাট ঘটনা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সমস্ত মিলে একটি অভিনব অনুভূতির, এমনকি একটা নতুনতর সত্তার আভাস ফুটে উঠে, মানব-আত্মার ও বিশ্বসংসারের গোপন রহস্যের যেন একটা আবছায়া গোচর হয়। উপন্যাসে আধুনিকতার এই একটা প্রকৃষ্ট গৌরব।

    মূলত সতীনাথ ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধের একটি তাৎপর্যময় কালকে উপন্যাসটিতে গ্রহণ করেছেন। ‘ভারত ছাড়ো’ আহ্বান একটি ব্যাপক জাগরণের সূচনা করেছিল সে সময়ে। মহাত্মাজির অসহযোগ আন্দোলন, উগ্রপন্থীদের ধ্বংসাত্মক আন্দোলন- থানা ও সরকারি অফিস দখল, রেললাইন উৎপাটন, টেলিগ্রাফ তার কেটে দেওয়া ইত্যাকার বিচিত্র ঘটনায় কম্পিত ভারতীয় রাজনৈতিক পটভূমিকা। গান্ধিজির অসহযোগকে গ্রহণযোগ্য মনে করে আদালতের উপযুক্ত আইনজীবী সতীনাথ টিকাপট্টির কংগ্রেসি আশ্রমে যোগদান করেন, আলোচ্য উপন্যাসের সরকারি স্কুলের হেডমাস্টার বিলুর বাবা মহাত্মাজির অসহযোগ আন্দোলনের শরিক হয়ে স্কুলের চাকরি ছেড়ে গান্ধি-সত্যাগ্রহ আশ্রম গড়ে তোলেন, তাঁর স্ত্রী তাঁর পথের অনুসারী হন- বিলু ও নীলু এ আশ্রমের শুদ্ধাশ্রয়ী আবহাওয়ায় মানুষ হয়েছিল। রাজনীতির স্পর্শ বাল্যজীবন থেকেই তারা পেয়ে এসেছে। দেশের স্বাধীনতার পুণ্যকর্মের অনুপ্রেরণায় সমগ্র পরিবারটি অনুপ্রাণিত হয়েছে, তাই তাকে রাষ্ট্রিক পরিবার বলে গণ্য করা হয়েছে। বয়ঃবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিলু-নীলু দুই ভাইয়ের মধ্যে গান্ধিবাদী আদর্শে ফাটল ধরেছে, প্রশ্ন জেগেছে তাদের মনে কংগ্রেসি রাজনীতি সম্পর্কে, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের সরিয়ে এনেছে মূলত দুটি কারণে। এক) কংগ্রেসের প্রাচীনধর্মী, প্রগতিবিরোধী কার্যধারা তাদের মনঃপুত হয়নি বলে; দুই) সমাজতন্ত্রী ভাবধারা, যা সদ্য দেশে আসতে শুরু করেছে তার প্রতি অধিকতর আকর্ষণ তারা বোধ করেছে বলে। কালের অমোঘ নিয়মে নীলু আরো দূরে অগ্রসর হয়ে ফ্যাসিবিরোধী শিবির তথা কমিউনিস্ট গোষ্ঠীভুক্ত হয়েছে। স্পষ্টতই তিনটি রাজনৈতিক মতবাদ উপন্যাসটির কেন্দ্রমূলে লক্ষ্য করা গেছে। গান্ধিবাদী মতাদর্শ, সোস্যালিস্ট ভাবধারা এবং ফ্যাসিবিরোধী গোষ্ঠীতন্ত্র- নিজে সতীনাথ প্রথম দলভুক্ত হয়েও আশ্চর্য সংযমের পরিচয় দিয়ে অপক্ষপাত দৃষ্টি রাখতে সক্ষম হয়েছেন। অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে গান্ধিবাদী দলে এসেছিলেন, তবু ভিতরে ভিতরে ‘রায়-ইস্ট হ্যায়’- অর্থাৎ এম. এন. রায়ের মতবাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সি. এস. পি. বা কমিউনিস্ট দলের ছেলেদের নিষ্ঠা লেখকের মতো নীলু-বিলুদের বাবাকে শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছে। তিনি দ্বিধাহীনভাবে চিন্তা করেছেন- ‘সোস্যালিস্টরা, ফরওয়ার্ড ব্লকের ছেলেরা, কম্যুনিস্ট ও কিষাণ সভার ছেলে দুইটি, সকলেরই পড়ার উৎসাহ দেখি, আর অবাক হইয়া আমাদের পন্থার কর্মীদের সহিত তুলনা করি।’এই খাঁটি কথা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে লেখকের রাজনৈতিক সততা ঈর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তিনি জানেন, ‘নীলু বিলুদের দলের প্রোগ্রামের ভিত্তি মানুষের মন আজ যেমন আছে তাহারই উপর…। একজন যথার্থ কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের প্রতি নিষ্ঠাবান কর্মীর মতই বিলুর পিতা বিশ্বাস করেন, ‘গণমতের উপর যে পার্টি নির্ভর করে, তাহার তো একমাত্র কর্ত্তব্য হওয়া উচিত জনতাকে অন্য দলের ভুলের কথা বুঝানো আর ভ্রান্তপথে চালিত জনতাকে নিজের দিকে করা- সতীনাথের মতো গান্ধিবাদী নেতার হৃদয়ের অন্তঃস্তল থেকে এসব কথা বলতে পারেন এজন্য যে তিনি জনগণের একজন ছিলেন। পূর্ণিয়ার গ্রামে গ্রামে তিনি মানুষের সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়েছেন। তাদের একজন হয়েছেন, দুঃখ ভাগ করে নিতে পেরেছেন। এইরকম গ্রামে-গঞ্জে সভা-সমিতি আয়োজনে ঘুরতে ঘুরতে লেখকের অভিজ্ঞতার সীমা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাঁর ছিল সততা ও নিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি নিবিড় মমত্ব। সতীনাথের এসব চারিত্রিক গুণের আধার বিলু ও নীলু চরিত্র দুটি।

    গান্ধিবাদের প্রবণতার ফলেই সতীনাথ রাজনীতিতে এসেছিলেন, তবু তথাকথিত কংগ্রেসি রাজনীতির সবটাই গ্রহণে তাঁর সংশয় দেখা দিয়েছিল। সেকারণে বিলু ও নীলু সোস্যালিস্ট দলভুক্ত হয়েছে, যারপ্রতি লেখকের অন্তরটান উপন্যাসটিতে লক্ষ করা যায়। নির্জন কারাকক্ষে মানবেন্দ্রনাথের রচনা তাঁর সঙ্গী হয়েছিল। কমিউনিস্ট ভাবধারা তাঁর অন্বিষ্ট নয়, তবু সোস্যালিজমের প্রতি তাঁর আগ্রহ কম ছিল না। বিলু তাঁর প্রার্থিত চরিত্র, কিন্তু বিয়াল্লিশের আন্দোলনে কি কংগ্রেসিদের কি সোস্যালিস্টদের খুব উল্লেখযোগ্য প্রোগ্রাম ছিল না, এর জন্য এত বড়ো আন্দোলন ছিন্নমূল হয়ে পড়েছিল। স্বভাবতই সতীনাথ ব্যক্তিগত আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কর্তব্য বিষয়ে সংশয়ে ছিলেন, বিলুর ধীরগতির রাজনৈতিক কার্যকলাপ এবং নীলুর অস্পষ্ট কমিউনিস্টভাবনা সেজন্যই উপন্যাসে একটি অনিশ্চিত পরিবেশ রচনা করেছে। দুটি কারণে উপন্যাসটি এ সমস্ত সংশয় উত্তীর্ণ হতে পেরেছে সতীনাথের রচনার সিদ্ধহস্ততা ও পক্ষপাতশূন্য রাজনীতিবোধ সেকারণ হিসেবে নির্দিষ্ট। নীলু চরিত্রের পরিণতির বিশ্বাস্যতা সম্পর্কে কারো কারো প্রশ্ন জেগেছে। বিরুদ্ধ শিবিরের কর্মী বলে নীলুর চেহারা ফ্যাসীবিরোধী গোষ্ঠী বা কমিউনিস্ট মহলের বিকৃত দৃষ্টান্ত একথা মেনে নেওয়া যায় না। বিয়াল্লিশের আন্দোলনের এই বিশেষ গোষ্ঠীর আচরণে ঐতিহাসিক দিক থেকে বিচার করলে অবিশ্বাসের প্রশ্ন ওঠে না। অহিংস আন্দোলন কিংবা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন গ্রহণযোগ্য বলে নাও মনে হতে পারে, কিন্তু এমন কোনো পথ নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য নয় যাতে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক ইংরেজের স্বার্থ রক্ষিত হয়। গান্ধিবাদী সতীনাথ ফ্যাসিবিরোধী তথা কমিউনিস্টদের সম্পর্কে এই জাতীয় ধারণা পোষণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। নীলু চরিত্রটি সৃষ্টি করতে গিয়ে সে ধারণাটি প্রতিফলন দেখা দিয়েছে। তত্ত্বগতভাবে বিপরীত শিবিরকে জানেন বলেও নীলু কিছুটা বিকৃত হয়ে দেখা দিয়েছে- প্রত্যক্ষ রাজনীতি দ্বারা তিনি কমিউনিজমের শরিক নন। দূর থেকে দেখা অভিজ্ঞতাই তাঁর সম্বল ছিল, কমিউনিস্ট কর্মী অপেক্ষা নীলু ব্যক্তি চরিত্র হিসেবেই হাজির হয়েছে সর্বত্র। নীলুর কথাবার্তা থেকে তা প্রমাণ করা যায়, যেমন, নিজের নির্দোষিতার সাফাই গাইতে সে বিলু প্রসঙ্গে বলেছে, ‘তাহার স্থান রাজনীতি ক্ষেত্রের বাহিরে। রাজনীতিক্ষেত্রে, আমি নীলু, আর সে দাদা নয়। অথবা ‘ভুল! পৃথিবীশুদ্ধ লোকের ভুল হইতে পারে, আমার ভুল হয় নাই।’ তাছাড়া পার্টির নেতাদের কথা বিরুদ্ধচারণ করে নিজ মত প্রকাশ করে দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদান কোনো কালের কমিউনিস্টপার্টির কর্মীর পক্ষে সম্ভব কিনা, সে কথাই বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে, তবে নীলু কমিউনিস্ট একথা লেখক জোরের সঙ্গে বলেন নি।

    রাজনীতি-আশ্রয়ী উপন্যাস মুখ্যত মানবজীবনের বিচিত্র তরঙ্গের গতিভঙ্গকে প্রকাশ করে থাকে। রাজনীতি এক জাতীয় জীবন, তবু মানব-জীবনরস পারিবারিক জীবন-আশ্রয়ী হতে বাধ্য। একটি রাষ্ট্রিক-পরিবারের কাহিনি সৃজন করতে বসে রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তকে সতীনাথ পরিবারের মধ্যে স্থাপন করেছেন। নানান মতের আদর্শ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বহু ঐতিহাসিক ঘটনা বিবৃত করলেও লেখক চরিত্র চিত্রণের দিকেও মনোযোগী ছিলেন এবং তার ফলস্বরূপ কাহিনির একটি বিশ্বাস্য পরিণতি দানে সক্ষম হয়েছেন। রাজনৈতিক তত্ত্ব বিশ্লেষণের জন্য তিনি লেখনি ধারণ করেননি। তাঁর উদ্দেশ্য উপন্যাস রচনা। তাই মানবিক দুঃখ-মিলনের নিত্যকার কাহিনি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়েই রূপলাভ করেছে। আপার ডিভিসনে বাবার স্মৃতিচারণ, সংসারের প্রতি স্ত্রী-পুত্রদের প্রতি তাঁর কর্তব্য ও আচরণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি ও ব্যষ্টিমনের নিকট-পরিচয় ধরা পড়েছে, আওরাত কিতায় মা’র ভূমিকা নিঃসন্দেহে উপন্যাসের হৃদয় প্রসারণের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়। ব্যক্তিজীবন রাজনৈতিক ধূলিঝড়ে কেমন উন্মূলিত হয়ে পড়তে পারে, উপন্যাসটি তারও উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তস্থল। যার উক্তি, এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য, তিনি গ্রন্থিহীন সংসারের কথা ভেবে মাহাত্মাজির উদ্দেশে বলেছেন, ‘গান্ধীজি তুমি আমার এ কী করলে? তুমি আমাদের একেবারে পথের ভিখিরি করে ছেড়েছ; সত্যিকারের ভিখিরি।… নিজের ঠাকুর দেবতা ছেড়ে তোমার পুজো করেছি…’ ইত্যাদি সংসারমনস্ক মায়ের করুণ আর্তির সঙ্গে রাজনৈতিক চঞ্চল পটভূমিকার পরিচয় জ্ঞাপন করে- এদিক থেকে ‘‘জাগরী’’ বাংলা উপন্যাসধারায় একটি অভিনব সংযোজন, ব্যক্তিজীবন ও রাষ্ট্রনীতিক জীবনের মিশ্রণে রচিত এ-জাতীয় উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বড় বেশি লেখা হয়নি। 

    মূলত তিরিশ ও চল্লিশের দশকে ভারতবর্ষে বিশেষ করে বাংলাদেশে মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে পরিচালিত অহিংস গণ-আন্দোলনের সঙ্গে মার্কসীয় দর্শনের অভিঘাতে কম্যুনিস্ট ও সোস্যালিস্ট চিন্তার যে সংঘর্ষ সূচিত হয়েছিল তারই সাহিত্যিক ভাষ্য ‘‘জাগরী’’। লেখক ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বিপুল রাজনৈতিক কর্মধারা সমৃদ্ধ একটি পরিবারের আদর্শকে বিভিন্ন চরিত্রের চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

একটি সম্ভাব্য ফাঁসিকে কেন্দ্র করে চারটি চরিত্রের স্মৃতিচারণ উপন্যাসে ঘটনাবিবৃতি, চরিত্রবিশ্লেষণ, মনস্তত্ত্ব ও মনোবিকার, রাজনীতি ও সমাজঘটিত জীবনের বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ রহস্যময় প্রতীকের ব্যঞ্জনা ‘‘জাগরী’’র পটভূমি, পরিবেশ এবং কাহিনি বিন্যাসে তার রূপ-রীতি ও আঙ্গিকের সামগ্রিক নতুনত্ব বাংলা সাহিত্যে সম্পূর্ণভাবে অভিনব। কারাজীবন এবং কারাজগতের মধ্যে থেকে কল্পিত চারটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে একটি বিপ্লবগন্ধী যুগের পারস্পরিক আদর্শের সংঘাত, মান-অভিমান, আত্মসংকট, দ্বন্দ্বতাড়িত বাঙালি মানস- এক কথায় একটি পরিবারের দুর্দম কর্মপ্রবাহ যা অগ্নিময় এবং জীবন্ত। ‘‘জাগরী’’তেই প্রথম ব্যক্তি চেতনা, সমাজসত্য, রাজনৈতিক চেতনা এবং জীবনসত্য বাস্তবনিষ্ঠ ও সত্যবদ্ধ।

৫.

‘‘জাগরী’’ স্বতন্ত্র, বিশিষ্ট ও অভিনব রচনা। মনোলোকের প্রবল কম্পনে আলোড়িত চারটি মানবসত্তার চিন্তাপ্রবাহ এখানে বর্ণিত হয়েছে। কাহিনিতে এই প্রবল আবেগ এবং পরিবেশের বাস্তবতা উপন্যাসটিকে পাঠকপ্রিয় করে তুলেছে। মানবমনের জটিল অন্তর্লোকের উন্মোচনে এ কাহিনি অনন্য। এক রজনীতে একই জেলের ভেতর-বাইরের চার জায়গায় চারজন- আপার ডিভিসন ওয়ার্ডে বাবা, আওরৎ কিতা বা ফিমেল ওয়ার্ডে মা, ফাঁসি সেলে বড় ছেলে বিলু এবং জেল গেটে ছোট ছেলে নীলু অপেক্ষা করছে রাত্রি অবসানে ফাঁসির মুহূর্তের জন্য। কাহিনির এই মর্মবিদারী সত্তা-আলোড়িত ঘটনা সত্যিই করুণ। ‘মাস্টার-সাহেবে’র পরিবার ‘রাষ্ট্রীয় পরিবার’ বলে সবাই জানে, কিন্তু বাবা-মা-দুই ছেলে পরস্পরের স্নেহ-ভালোবাসা-বাৎসল্যের প্রবল আকর্ষণ-বিকর্ষণের সংবাদ বাইরের লোক জানে না। সেই অন্তরঙ্গ মধুর পারিবারিক স্নেহ-সম্পর্কের আবরণ এখানে উন্মোচিত হয়েছে যথোচিত নৈপুণ্যের সঙ্গে। এতেই পাঠক অভিভূত হয়েছে। সতীনাথ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন- ‘হৃদয় দিয়ে না নিতে পারলে তৃপ্তি পাই না। শরৎচন্দ্রই বোধ হয় আমার রুচিবিকারের মূলে। দুঃখের কাহিনী পড়বার সময়ে আমি চাইনে চোখের পাতা অজান্তে ভিজে উঠুক।’‘‘জাগরী’’ সম্পর্কে লেখকের এই বিচার নির্ভুল। কাছের থেকে দেখা, ভাবাপ্লুত মন নিয়ে দেখা, বিহ্বলতায় চালিত হয়ে দেখা; শরৎচন্দ্রীয় পদ্ধতি। এই পদ্ধতির প্রভাব রয়েছে ‘‘জাগরী’’তে। ‘ভাবাপ্লুত মন নিয়ে দেখার পরিচয় এ উপন্যাসে ছড়িয়ে আছে। আদর্শনিষ্ঠ প্রধান চরিত্রগুলোর জীবনে চরম দুঃখ ও ব্যর্থতা ঘটেছে, শুধু সংসারের কষ্ট লাঞ্ছনা, পরাজয় নয়, মৃত্যুদণ্ড ও প্রিয়জনের আসন্ন মৃত্যু নয়, তার চেয়ে নিদারুণ ব্যাপার- পরমাত্মীয়ের ও প্রীতিভাজনের নিকট থেকে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। আদর্শনিষ্ঠার শোচনীয় ব্যর্থতা এদের জীবনে যেন একটা চূড়ান্ত গ্লানি ও ব্যর্থতার কালি এনে দিয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশের কারণে ‘‘জাগরী’’ বিশ্বাস্যতা এনে দিয়েছে। লেখকের নিজের রাজনৈতিক জীবন ও কারাজীবনের অভিজ্ঞতার বয়ান রয়েছে উপন্যাসে। ১৯৪২-এর আগস্টের ঘটনাসমূহের যে বর্ণনা নীলু চরিত্রের মাধ্যমে বিধৃত হয়েছে তা সতীনাথেরই ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা। পূর্ণিয়া জেলার গ্রাম ও শহরের মানুষের দাবি-আন্দোলনের জোয়ারে ভাসা উন্মত্ত বিশৃঙ্খলা, প্রাণদানে আগ্রহী মানুষের ছবি এ উপন্যাসে নিখুঁতভাবে এসেছে। তার সঙ্গে এসেছে ভাগলপুর সেন্ট্রাল জেলের বন্দিদের ছবি। অন্যদিকে অন্তর্লোকের উন্মোচনে ‘‘জাগরী’’ উপন্যাসের স্বকীয়তা স্বীকৃত। মানবমনের জটিল অন্তর্লোক উন্মোচনে লেখকের শিল্পসামর্থ্য এ উপন্যাসে লক্ষ করা যায়।

(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস,  বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com)

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Total Post : 265
https://kera4d.wildapricot.org/ https://kera4dofficial.mystrikingly.com https://jasaslot.mystrikingly.com/ https://kera4dofficial.bravesites.com/ https://kera4dofficial2.wordpress.com/ https://nani.alboompro.com/kera4d https://joyme.io/jasa_slot https://msha.ke/mondayfree https://mssg.me/kera4d https://bop.me/Kera4D https://influence.co/kera4d https://heylink.me/bandarkera/ https://about.me/kera4d https://hackmd.io/@Kera4D/r10h_V18s https://hackmd.io/@Kera4D/r12fu4JIs https://hackmd.io/@Kera4D/rksbbEyDs https://hackmd.io/@Kera4D/SysmLVJws https://hackmd.io/@Kera4D/SyjdZHyvj https://hackmd.io/@Kera4D/HJyTErJvj https://hackmd.io/@Kera4D/rJi4dS1Do https://hackmd.io/@Kera4D/HypL_woPi https://hackmd.io/@Kera4D/ByfixFaPs https://hackmd.io/@Kera4D/Skm9S9aws https://hackmd.io/@Kera4D/r19qL5aPo https://tap.bio/@Kera4D https://wlo.link/@Kera4DSlot https://beacons.ai/kera4d https://allmy.bio/Kera4D https://jemi.so/kera4d939/kera4d https://jemi.so/kera4d https://jemi.so/kera4d565 https://linktr.ee/kera.4d https://solo.to/koshikera4d https://onne.link/kera4d https://linkby.tw/KERA4D https://lu.ma/KERA4D https://lynk.id/kera4d https://linky.ph/Kera4D https://lit.link/en/Kera4Dslot https://manylink.co/@Kera4D https://linkr.bio/Kera_4D http://magic.ly/Kera4D https://mez.ink/kera4d https://lastlink.bio/kera4d https://sayhey.to/kera4d https://sayhey.to/kera_4d https://beacons.ai/kera_4d https://drum.io/upgrade/kera_4d https://jaga.link/Kera4D https://biolinku.co/Kera4D https://linkmix.co/12677996 https://linkpop.com/kera_4d https://joy.link/kera-4d https://bit.ly/m/Kera_4D https://situs-gacor.8b.io/ https://bop.me/Kera4D https://linkfly.to/Kera4D https://betaloop.io/kera4d https://nethouse.id/kera4d https://conecta.bio/kera4d https://linklist.bio/Kera.4D https://www.flowcode.com/page/kera4d https://Kera4D.minisite.ai https://kera4d.taplink.ws https://linki.ee/Kera4D https://instabio.cc/Kera4D https://kwenye.bio/@kera4d https://linp.io/Kera4D https://issuu.com/kera4dofficial/docs/website_agen_slot_dan_togel_online_terpercaya_kera https://sites.google.com/view/kera4d https://www.statetodaytv.com/profile/situs-judi-slot-online-gacor-hari-ini-dengan-provider-pragmatic-play-terbaik-dan-terpercaya/profile https://www.braspen.org/profile/daftar-situs-judi-slot-online-gacor-jackpot-terbesar-2022-kera4d-tergacor/profile https://www.visitcomboyne.com/profile/11-situs-judi-slot-paling-gacor-dan-terpercaya-no-1-2021-2022/profile https://www.muffinsgeneralmarket.com/profile/daftar-nama-nama-situs-judi-slot-online-terpercaya-2022-online24jam-terbaru/profile https://www.clinicalaposture.com/profile/keluaran-sgp-pengeluaran-toto-sgp-hari-ini-togel-singapore-data-sgp-prize/profile https://www.aphinternalmedicine.org/profile/link-situs-slot-gacor-terbaru-2022-bocoran-slot-gacor-hari-ini-2021-2022/profile https://www.tigermarine.com/profile/daftar-bocoran-slot-gacor-hari-ini-2022-gampang-menang-jackpot/profile https://www.arborescencesnantes.org/profile/data-hk-hari-ini-yang-sangat-dibutuhkan-dalam-togel/profile https://www.jwlconstruction.org/profile/daftar-situs-judi-slot-online-sensational-dengan-pelayanan-terbaik-no-1-indonesia/profile https://techplanet.today/post/langkah-mudah-memenangkan-judi-online https://techplanet.today/post/daftar-situs-judi-slot-online-gacor-mudah-menang-jackpot-terbesar-2022 https://techplanet.today/post/daftar-10-situs-judi-slot-terbaik-dan-terpercaya-no-1-2021-2022-tergacor https://techplanet.today/post/sejarah-perkembangan-slot-gacor-di-indonesia https://techplanet.today/post/permainan-live-casino-spaceman-gokil-abis-2 https://techplanet.today/post/daftar-situs-slot-yang-terpercaya-dan-terbaik-terbaru-hari-ini https://techplanet.today/post/daftar-situs-judi-slot-online-sensational-dengan-pelayanan-terbaik-no-1-indonesia-1 https://techplanet.today/post/11-situs-judi-slot-paling-gacor-dan-terpercaya-no-1-2021-2022 https://techplanet.today/post/daftar-nama-nama-situs-judi-slot-online-terpercaya-2022-online24jam-terbaru-2 https://techplanet.today/post/kumpulan-daftar-12-situs-judi-slot-online-jackpot-terbesar-2022 https://techplanet.today/post/daftar-bocoran-slot-gacor-hari-ini-2022-gampang-menang-jackpot https://techplanet.today/post/daftar-situs-judi-slot-online-gacor-jackpot-terbesar https://techplanet.today/post/mengenal-taruhan-esport-saba-sport https://techplanet.today/post/situs-judi-slot-online-gacor-hari-ini-dengan-provider-pragmatic-play-terbaik-dan-terpercaya https://techplanet.today/post/mengetahui-dengan-jelas-tentang-nama-nama-situs-judi-slot-online-resmi https://techplanet.today/post/kera4d-situs-judi-slot-online-di-indonesia https://truepower.mn/?p=652 https://www.icmediterranea.com/es/panduan-permainan-sweet-bonanza/ https://nativehorizons.com/panduan-permainan-sweet-bonanza-2022/ https://www.rightstufflearning.com/rumus-gacor-permainan-slot-tahun-2022/ https://africafertilizer.org/daftar-situs-slot-yang-terpercaya-dan-terbaik/ https://vahsahaswan.com/daftar-situs-slot-yang-terpercaya-dan-terbaik/ https://cargadoresbaratos.com/langkah-mudah-memenangkan-judi-online/ https://hadal.vn/?p=25000 https://techplanet.today/post/mengenal-metode-colok-angka-permainan-togel https://techplanet.today/post/togel-hongkong-togel-singapore-keluaran-sgp-keluaran-hk-hari-ini https://techplanet.today/post/kera4d-link-alternatif-login-terbaru-kera4d-situs-resmi-bandar-togel-online-terpercaya https://trickcraze.com/panduan-permainan-sweet-bonanza/ https://blog.utter.academy/?p=1197 https://africafertilizer.org/langkah-mudah-memenangkan-judi-online/ https://www.lineagiorgio.it/11496/ https://www.piaget.edu.vn/profile/daftar-situs-slot-yang-terpercaya-dan-terbaik-terbaru-hari-ini/profile https://www.gybn.org/profile/11-situs-judi-slot-gacor-terbaik-dan-terpercaya-no-1-2021-2022/profile https://www.caseychurches.org/profile/cara-jitu-untuk-menang-nomor-togel-4d/profile https://www.gcbsolutionsinc.com/profile/mengenal-metode-colok-angka-permainan-togel/profile https://joyme.io/togel2win https://mssg.me/togel2win https://bop.me/Togel2Win https://influence.co/togel2win https://heylink.me/Togel2Win_official/ https://about.me/togel2.win https://www.behance.net/togel2win_official https://togel2win.wildapricot.org/ https://joyme.io/togel2win https://tap.bio/@Togel2Win https://wlo.link/@Togel2Win https://beacons.ai/togel2win https://allmy.bio/Togel2Win https://jemi.so/togel2win https://jemi.so/togel2win565 https://onne.link/togel2win https://lu.ma/Togel2Win https://solo.to/togel2win https://lynk.id/togel2win https://linktr.ee/togel2.win https://linky.ph/Togel2Win https://lit.link/en/Togel2Win https://manylink.co/@Togel2Win https://linkr.bio/Togel2Win https://mez.ink/togel2win https://lastlink.bio/togel2win https://sayhey.to/togel2win https://jaga.link/Togel2Win https://biolinku.co/Togel2Win https://linkmix.co/13001048 https://linkpop.com/togel2-win https://joy.link/togel2winn https://bit.ly/m/togel2win https://situs-tergacor.8b.io/ https://linkfly.to/Togel2Win https://jali.me/Togel2Win https://situs-tergacor.8b.io/ https://tap.bio/@Togel2Win
https://slotbet.online/