Prof. Dr. Milton Biswas : লিও তলস্তয়ের আন্না কারেনিনা: বিষয়বস্তু ও স্থাপত্যশৈলী ।।
লিও তলস্তয়ের আন্না কারেনিনা (১৮৭৮) বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক অতুলনীয় ও অবিস্মরণীয় সৃষ্টি, যা বাস্তববাদী উপন্যাসের সংজ্ঞাকেই নতুন করে নির্মাণ করেছে। এই উপন্যাসটি কেবল একটি পরকীয়া প্রেমের কাহিনি নয়, বরং এটি উনবিংশ শতাব্দীর রুশ সমাজের এক মহাকাব্যিক চিত্রশালা, যেখানে নৈতিকতা, ধর্ম, রাজনীতি, কৃষি এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে । তলস্তয় নিজে আন্না কারেনিনাকে তাঁর “প্রথম প্রকৃত উপন্যাস” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, কারণ তাঁর পূর্ববর্তী বিশ্ববিখ্যাত কাজ “যুদ্ধ ও শান্তি”-কে তিনি মহাকাব্য ও ইতিহাসের সংমিশ্রণ মনে করলেও আন্না কারেনিনাকে তিনি দেখেছিলেন একটি নিখুঁত শিল্পকলা বা স্থাপত্য হিসেবে । এই উপন্যাসের শিল্পরূপ বা স্থাপত্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তলস্তয় বলেছিলেন যে, এর খিলানগুলো এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে যে তাদের জোড়াতালি বা ‘কীস্টোন’ (Keystone) খুঁজে পাওয়া অসম্ভব; এই একীভূতকরণ প্লট বা চরিত্রের পরিচয়ের মাধ্যমে নয়, বরং এক ধরনের ‘অভ্যন্তরীণ সংযোগ’ বা ‘ইনার লিঙ্কেজ’ (Inner Linkage)-এর মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে ।
উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও ত্রিমাত্রিক পারিবারিক কাঠামো
আন্না কারেনিনা উপন্যাসের বিষয়বস্তু অত্যন্ত গভীর ও বহুমুখী। উপন্যাসের প্রারম্ভিক বিখ্যাত বাক্য— “সুখী সমস্ত পরিবার একে অন্যের মতন, অসুখী প্রতিটি পরিবার নিজের নিজের ধরনে অসুখী”— সমগ্র উপন্যাসের থিম বা মূলসুর নির্ধারণ করে দেয় । তলস্তয় এখানে প্রধানত তিনটি পরিবারের পারস্পরিক সংকট ও বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছেন: ওবলনস্কি পরিবার, কারেনিন পরিবার এবং লেভিন পরিবার। এই তিনটি পরিবারের কাহিনি সমান্তরালভাবে এগিয়ে চললেও এদের প্রত্যেকের সংকট তৎকালীন রুশ সমাজবাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন দিক উন্মোচিত করে ।
ওবলনস্কি পরিবার: নৈতিক অবক্ষয় ও লঘু জীবনবোধ
উপন্যাসটি শুরু হয় স্তেপান আর্কাদিচ ওবলনস্কি (স্তিভা)-এর গৃহবিবাদের মধ্য দিয়ে। স্তিভা তাঁর সন্তানদের ফরাসি গৃহশিক্ষিকার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ফলে তাঁর স্ত্রী ডল্লির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে । স্তিভার চরিত্রটি তৎকালীন রুশ অভিজাত সমাজের লঘু আমোদ ও নৈতিক উদাসীনতার প্রতীক। তিনি তাঁর অপরাধের জন্য অনুতপ্ত নন, বরং তাঁর মূল দুঃখ এই যে, তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে তাঁর এই সম্পর্কটি আরও ভালো করে লুকিয়ে রাখতে পারেননি । তলস্তয় এখানে দেখিয়েছেন যে, স্তিভার মতো ব্যক্তিরা জীবনকে কেবল ইন্দ্রিয়সুখের আধার হিসেবে দেখেন এবং ধর্ম বা নৈতিকতাকে কেবল একটি সামাজিক প্রথা হিসেবে বিবেচনা করেন । স্তিভা এবং ডল্লির সম্পর্কের এই ফাটল মেরামতের উদ্দেশ্যেই আন্না কারেনিনা সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে মস্কোয় আসেন, যা তাঁর নিজের জীবনের ট্র্যাজেডিরও সূচনা করে ।
কারেনিন পরিবার: সামাজিক শৃঙ্খলা বনাম ব্যক্তিগত আবেগ
আন্না কারেনিনা এবং আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিনের দাম্পত্য জীবন উনবিংশ শতাব্দীর উচ্চবিত্ত সমাজের যান্ত্রিক শৃঙ্খলার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আন্নার স্বামী কারেনিন একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যাঁর কাছে সামাজিক মর্যাদা ও বাহ্যিক আবরণ রক্ষা করাটাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য । আন্না যখন তরুণ কাউন্ট ভ্রনস্কির প্রেমে পড়েন, তখন কারেনিনের প্রথম উদ্বেগ ছিল আন্নার নৈতিকতা নিয়ে নয়, বরং সমাজের চোখে তাঁদের সম্মান নষ্ট হওয়া নিয়ে । আন্নার প্রেম এই কৃত্রিম ও মৃতপ্রায় শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে এক অনিবার্য বিদ্রোহ। তিনি অনুভব করেন যে, তিনি একজন জীবন্ত মানুষ এবং তাঁর ভালোবাসার ও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে । তলস্তয় এখানে অত্যন্ত কুশলীভাবে আন্নার ব্যক্তিগত আবেগকে তৎকালীন রুশ সমাজের আমলাতান্ত্রিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে স্থাপন করেছেন ।
লেভিন ও কিটি: আদর্শ বিবাহ ও আধ্যাত্মিক উত্তরণ
উপন্যাসের সমান্তরাল কাহিনির অন্য প্রান্তে রয়েছে কন্সতান্তিন লেভিন এবং কিটি শ্যেরবাৎস্কায়ার কাহিনি। লেভিন চরিত্রটি মূলত তলস্তয়ের নিজেরই এক প্রকার আত্ম-প্রতিকৃতি। লেভিন একজন ভূস্বামী, যিনি শহরের কৃত্রিম জীবনের চেয়ে গ্রাম্য জীবনের সরলতাকে পছন্দ করেন। কিটির প্রতি তাঁর প্রেম এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাঁদের সুখী দাম্পত্য জীবন আন্না-ভ্রনস্কির ধ্বংসাত্মক প্রেমের বিপরীতে এক উজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে কাজ করে । লেভিনের কাহিনিতে তলস্তয় কেবল প্রেমের কথা বলেননি, বরং কৃষি ব্যবস্থা, শ্রমিকের অধিকার এবং মানুষের ঈশ্বর বিশ্বাসের বিবর্তনকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। লেভিন উপন্যাসের শুরুতে একজন নাস্তিক হিসেবে থাকলেও দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত তিনি খ্রিস্টীয় আদর্শের মাধ্যমে জীবনের অর্থ খুঁজে পান ।
উপন্যাসের শিল্পরূপ: স্থাপত্য ও অভ্যন্তরীণ লিঙ্কেজ
তলস্তয় আন্না কারেনিনার স্থাপত্য বা ‘আর্কিটেকচার’ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, এই উপন্যাসের প্রকৃত শক্তি এর প্লটে নয়, বরং এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে । অনেকে সমালোচনা করেছিলেন যে, আন্না এবং লেভিনের কাহিনির মধ্যে কোনো বাহ্যিক সংযোগ নেই। কিন্তু তলস্তয় এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন যে, উপন্যাসের একীভূতকরণ চরিত্রের পরিচয়ের চেয়ে বড় কোনো ‘ভাবনা’ বা ‘আইডিয়া’-র মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে ।
অভ্যন্তরীণ সংযোগের প্রকৌশল
তলস্তয়ের মতে, উপন্যাসের স্থাপত্য তৈরি হয়েছে চরিত্রদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সমান্তরাল অবস্থার মধ্য দিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, আন্না যখন তাঁর প্রেমের জন্য পরিবার ও সমাজ ত্যাগ করছেন, তখন লেভিন একইভাবে তাঁর খামারের শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করছেন এবং নতুন জীবনের পথ খুঁজছেন। এই দুই কাহিনির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে ‘পরিবার’ এবং ‘বিশ্বাস’-এর থিম । আন্না এবং লেভিনের মধ্যকার এই ‘ইনার লিঙ্কেজ’ বা অভ্যন্তরীণ সংযোগটি তলস্তয় এমনভাবে নির্মাণ করেছেন যে, পাঠক অবচেতনভাবে তাঁদের জীবনের উত্থান-পতনের তুলনা করতে বাধ্য হন ।
বাস্তববাদ ও মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা
আন্না কারেনিনার শিল্পরূপের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা (Psychological Realism)। তলস্তয় চরিত্রদের মনের অবস্থা বোঝাতে শারীরিক লক্ষণগুলো ব্যবহার করতেন। যেমন, উপন্যাসে চরিত্রদের ঘন ঘন ‘লজ্জায় লাল হওয়া’ (Blushing) তাদের অন্তরের সত্যতা বা গোপন অনুভূতি প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম । স্তেপান ওবলনস্কির “নির্বোধ হাসি” (Reflex Smile) যখন তাঁর অপরাধ ফাঁস হয়, তখন তাঁর অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশ করে । তলস্তয় এখানে মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিবর্তী ক্রিয়া (Reflex actions) এবং শারীরিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে তাঁদের গহীন চরিত্র উন্মোচন করেছেন যা ফরাসি বা ইংরেজি উপন্যাসে বিরল ছিল।
প্রতীকবাদ ও প্রতীকী স্থাপত্য
উপন্যাসের শিল্পরূপে প্রতীকের ব্যবহার অত্যন্ত গভীর ও সুপরিকল্পিত। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘রেলওয়ে’ বা রেলপথের প্রতীক। রেলপথ এখানে কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এটি আধুনিকতা এবং ট্র্যাজেডির এক অশুভ বাহন। উপন্যাসের শুরুতে রেলস্টেশনে এক রক্ষীর মৃত্যু আন্নার অশুভ পরিণতির সংকেত দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ট্রেনের তলাতেই জীবন বিসর্জন দেন । রেলপথের এই চিত্রকল্পটি উপন্যাসের শুরুতে একটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করে এবং শেষে ট্র্যাজেডির সমাপ্তি ঘটায় ।
অন্য একটি শক্তিশালী প্রতীক হলো ‘ভয়ংকর বৃদ্ধ কৃষক’ বা মুঝিকের (Peasant) স্বপ্ন। আন্না এবং ভ্রনস্কি উভয়েই একই রকমের অস্পষ্ট ও ভয়াবহ স্বপ্ন দেখেন যা মৃত্যুর পূর্বাভাস বহন করে। এছাড়া ‘ঘোড়দৌড়’ (Steeplechase)-এর দৃশ্যটি আন্নার জীবনের একটি নিখুঁত রূপক। ভ্রনস্কির অসতর্কতায় তাঁর প্রিয় ঘোড়া ফ্রু-ফ্রু-র মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া মূলত আন্নার প্রতি ভ্রনস্কির দায়িত্বহীনতা এবং আন্নার সামাজিক পতনের সমান্তরাল এক চিত্র ।
সামাজিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি: উনবিংশ শতাব্দীর রাশিয়া
আন্না কারেনিনা উপন্যাসটি উনবিংশ শতাব্দীর ৭০-এর দশকের রুশ সমাজের এক নিপুণ দলিল। তৎকালীন সম্রাট দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সংস্কারমূলক কার্যাবলি এবং তার ফলে রুশ সমাজে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা উপন্যাসের প্রতিটি পরতে মিশে আছে ।
সংস্কারের যুগ ও কৃষি সংকট
তলস্তয় লেভিনের চরিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন রাশিয়ার কৃষি সংকট ও ভূমি সংস্কারের চিত্র তুলে ধরেছেন। লেভিন অনুভব করতেন যে, রাশিয়ার উন্নয়ন কেবল পশ্চিমা যান্ত্রিক সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে হবে না, বরং এর জন্য প্রয়োজন মাটির কাছাকাছি মানুষের উন্নয়ন । রেললাইনের দ্রুত বিস্তার কিভাবে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল, তলস্তয় তা বিশদভাবে আলোচনা করেছেন । লেভিনের মতে, রেলওয়ে বা ক্রেডিট সিস্টেমের মতো আধুনিক জিনিসগুলো রাশিয়ার জন্য অকল্যাণকর হতে পারে যদি কৃষির সঠিক উন্নয়ন না ঘটে ।
সামাজিক দ্বিচারিতা ও নারীর অবস্থান
উপন্যাসে রুশ সমাজের যে নৈতিক মানদণ্ড দেখানো হয়েছে, তা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। ভ্রনস্কির মতো পুরুষরা পরকীয়ায় লিপ্ত হলে সমাজ তাকে লঘু চোখে দেখে, কিন্তু আন্না যখন সেই একই কাজ করেন এবং তাঁর সততার কারণে তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, তখন সমাজ তাকে “পতিত” হিসেবে ঘোষণা করে । আন্নার ট্র্যাজেডি মূলত সমাজের এই ভণ্ডামির ফল। সমাজ আন্নাকে ক্ষমা করতে পারেনি কারণ তিনি সামাজিক ‘অভিনয়’ না করে নিজের অনুভূতির প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকতে চেয়েছিলেন ।
লেভিনের চরিত্র: তলস্তয়ের আধ্যাত্মিক প্রতিফলন
আন্না কারেনিনার শিল্পরূপে লেভিন চরিত্রটি কেবল আন্নার কাহিনির একটি বৈপরীত্য নয়, বরং এটি লেখকের নিজস্ব দর্শন প্রচারের একটি মঞ্চ। লেভিনের মাধ্যমে তলস্তয় জীবনের অস্তিত্ব ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের যন্ত্রণাকে ব্যক্ত করেছেন ।
সন্দেহ থেকে বিশ্বাসে উত্তরণ
লেভিনের চরিত্রটি শুরু হয় সন্দেহবাদী বা নাস্তিক হিসেবে। তিনি বিজ্ঞানের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা নিয়ে প্রফেসরের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন, কিন্তু সেই ব্যাখ্যা তাঁর আত্মার তৃপ্তি দিতে পারে না । ভাই নিকোলাইয়ের মৃত্যুশয্যায় দাঁড়িয়ে লেভিন মৃত্যুর ভয়ংকর সত্যকে উপলব্ধি করেন এবং জীবনের অসারতা নিয়ে শঙ্কিত হন । কিন্তু পরবর্তীতে কিটির সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য জীবন এবং তাঁর প্রথম সন্তানের জন্মের সময় তিনি প্রার্থনায় নিবেদিত হন। তলস্তয় দেখিয়েছেন যে, যুক্তি দিয়ে নয় বরং জীবনের প্রতি ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত ঈশ্বরের সন্ধান পায় ।
কৃষি-দর্শন ও শ্রমের মর্যাদা
লেভিনের খামারে ঘাস কাটার (Mowing scene) বিখ্যাত দৃশ্যটি উপন্যাসের একটি শৈল্পিক চূড়া। এখানে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে লেভিন তাঁর নিজের অস্তিত্বের সার্থকতা খুঁজে পান। তলস্তয় এখানে দেখিয়েছেন যে, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতা কেবল শারীরিক শ্রম ও প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মাধ্যমেই দূর হতে পারে । লেভিনের এই দর্শনটি তৎকালীন রাশিয়ার ভূমিহীন কৃষক ও জোতদারদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার একটি প্রয়াস ছিল ।
আন্না কারেনিনার ট্র্যাজেডি ও শিল্পীয় সত্য
আন্নার মৃত্যু মূলত সমাজের নিষ্ঠুরতা এবং তাঁর নিজের মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার এক ঘনীভূত রূপ। আন্না যখন অনুভব করেন যে ভ্রনস্কির প্রেম তাঁর জীবন থেকে ফুরিয়ে আসছে, তখন তাঁর কাছে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না ।
নৈতিকতা বনাম ট্র্যাজেডি
তলস্তয় আন্নাকে একজন অপরাধী হিসেবে নয়, বরং একজন করুণাময় ও ভাগ্যবিড়ম্বিত নারী হিসেবে এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, আন্নার এই “পাপ” আসলে তাঁর জীবনের প্রতি অদম্য তৃষ্ণা থেকে জন্মেছে । আন্না বলেছেন, “ঈশ্বর যদি আমাকে এমন একটি নারী হিসেবে গড়ে থাকেন যে ভালোবাসতে চায়, বাঁচতে চায়, তাহলে সেই দোষ তো আমার নয়” । তলস্তয় এই উপন্যাসে ব্যভিচারীদের ঘৃণা করেননি, বরং তাঁদের প্রতি করুণা প্রদর্শন করেছেন। আন্নার মৃত্যু মূলত সমাজের পদ্ধতিগত ব্যর্থতার ফল।
বাস্তববাদী চিত্রকলার প্রভাব
উপন্যাসের পঞ্চম অংশে শিল্পী মিখাইলোভের কাহিনিটি তলস্তয়ের শিল্প দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মিখাইলোভ যখন আন্নার পোর্ট্রেট আঁকছিলেন, তখন তিনি আন্নার অন্তরের সেই বিশেষ মাধুর্য ধরতে পেরেছিলেন যা ভ্রনস্কিও পারেননি। তলস্তয় এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃত শিল্প কেবল টেকনিক বা যান্ত্রিক নৈপুণ্য নয়, বরং এটি হলো শিল্পীর নিজের ভেতরকার সত্যকে উন্মোচন করা। মিখাইলোভের খ্রিস্টের চিত্রটি নিয়ে গোলেনিশ্যেভের বিতর্ক এবং টেকনিক নিয়ে ভ্রনস্কির প্রশংসা—এই সবকিছুই তলস্তয় ব্যবহার করেছেন তাঁর নিজের শিল্প-তত্ত্ব (What is Art?) প্রচারের জন্য।
আন্না কারেনিনার শাশ্বত প্রাসঙ্গিকতা: আধুনিক বিশ্লেষণ
১২০ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আন্না কারেনিনা কেন আজও আধুনিক পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক? এর উত্তর নিহিত রয়েছে উপন্যাসের বিষয়বস্তুর শাশ্বত আবেদনে। মানুষের প্রেম, ঈর্ষা, সন্দেহ, পারিবারিক বন্ধন এবং আধ্যাত্মিক সংকট—এই বিষয়গুলো কখনও পুরনো হয় না ।
আধুনিকতা ও মনস্তত্ত্ব
আজকের দিনে আন্নার পরকীয়া হয়তো আগের মতো “ক্ষমাহীন পাপ” হিসেবে বিবেচিত হবে না, কিন্তু সম্পর্কের টানাপোড়েন, সন্দেহের বিষ এবং একাকীত্বের যন্ত্রণা আজও একই রকম রয়ে গেছে । আন্নার মনের ভেতরে যে “অতলস্পর্শ গহ্বর” তৈরি হয়েছিল, তা আজও বহু মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা । তলস্তয় আন্নার মৃত্যুর যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আধুনিক সাহিত্যে “স্ট্রিম অফ কনশাসনেস” বা চেতনাপ্রবাহ পদ্ধতির এক আদি ও অতুলনীয় উদাহরণ ।
শিল্পীয় স্থাপত্যের সামগ্রিকতা
আন্না কারেনিনা একটি স্থাপত্য হিসেবে সফল কারণ এটি জীবনের আলোকচিত্র নয়, বরং জীবনের সারমর্ম। তলস্তয় এখানে দেখিয়েছেন যে, শিল্পকে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা নৈতিক শিক্ষার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়; শিল্পের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের হৃদয়ের সত্যকে প্রকাশ করা । উপন্যাসের ৮টি অংশ এবং ২৩৯টি অধ্যায়ের মধ্যে যে সুসংহত বুনন রয়েছে, তা আজও সাহিত্যের ছাত্রদের জন্য একটি গবেষণার বিষয় ।
পরিশেষে বলা যায়, আন্না কারেনিনা উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও শিল্পরূপ এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। এর বিষয়বস্তু যেখানে উনবিংশ শতাব্দীর রুশ সমাজকে ধারণ করে আছে, এর শিল্পরূপ সেখানে তাকে চিরকালীন সত্যে উন্নীত করেছে। তলস্তয়ের এই মহৎ সৃষ্টিটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের সমস্ত আনন্দ ও যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে রয়েছে মানুষের আধ্যাত্মিক জাগরণ এবং ভালোবাসার প্রকৃত শক্তি। ফিওদর দস্তয়েভস্কির সেই কথাটিই আজও সত্য— পৃথিবী যদি লিখতে পারত, তবে সে আন্না কারেনিনার মতোই লিখত।
ননী ভৌমিকের অনুবাদ ও বাংলা সাহিত্যে আন্না কারেনিনা
বাঙালি পাঠকদের কাছে আন্না কারেনিনার আবেদন চিরকালই অম্লান। ননী ভৌমিকের অনুবাদ এই মহৎ সৃষ্টিটিকে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। সোভিয়েত আমলের রাদুগা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই অনুবাদটি মূল রুশ থেকে করা হয়েছে, যা এর শৈল্পিক আবেদনকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ করেনি। ননী ভৌমিকের অনুবাদের কারণে বাঙালি পাঠক রুশ জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি, যেমন সামোভার থেকে চা খাওয়া বা ট্রইকায় চড়ে চলাচলের দৃশ্যগুলো স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারে।
অনুবাদের স্থাপত্য ও ভাষা
ননী ভৌমিক তাঁর অনুবাদে রুশ নামের জটিলতাগুলো খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। রুশ সমাজে সম্বোধনের যে বৈচিত্র্য—নামের সঙ্গে পিতৃনাম যোগ করা বা আদরের ডাকনাম ব্যবহার করা—তা অনুবাদের মাধ্যমে খুব সাবলীলভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তলস্তয়ের ভাষা যেমন ঋজু ও গম্ভীর, ননী ভৌমিকের বাংলা অনুবাদেও সেই গাম্ভীর্য বজায় রাখা হয়েছে। মিখাইল শলোখভ তলস্তয়কে যে “মহামহিম অলঙ্ঘ্য শিখর” বলেছেন, ননী ভৌমিকের অনুবাদে সেই শিখরের উচ্চতা অনুভব করা যায়।






















